সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নের কুরসি ও ধীতপুর গ্রামে যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বর্তমানে জরাজীর্ণ ও ভাঙা ঘরে চরম মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

ভাঙনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, অনেক পরিবার তাদের আসবাবপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে বালুর বস্তা বা জিওব্যাগ ডাম্পিং করে ভাঙন রোধ করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, ধীতপুর, কুরসি ও বারপাখিয়া গ্রামে যমুনার তাণ্ডব শুরু হয়, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। গত তিন মাসে বসতবাড়ির পাশাপাশি কৃষকদের শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে।

এখন পর্যন্ত ভাঙনের মুখে ২ টি মসজিদ, ২ টি মাদরাসা, ২ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি ইউনিয়ন পরিষদ অফিস, দুই শতাধিক বসতবাড়ি, ২ হাজার বিঘা আবাদি জমি ও অসংখ্য গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তলিয়ে যাওয়া জমিতে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, সরিষা, বাদাম, তিল, কাউন, গম, ভুট্টা ও সবজি চাষ করা হতো। এছাড়া ধীতপুর-কুরসি হাট-বাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের কৃষিপণ্য ও গবাদিপশু কেনাবেচায় ব্যাপক ধস নেমেছে।

ধীতপুর ঘোনাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হাফিজ উদ্দিন, নুরুল ইসলাম ও জিন্নাহ মণ্ডল জানান, এলাকাটি রক্ষায় দ্রুত বালুভর্তি জিওটিউব বা বস্তা ফেলা জরুরি। তবে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এই চরাঞ্চলের মানুষের গুরুত্ব না দেওয়ায় এখনও বস্তা ফেলার কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন।

কুরসি গ্রামের ভুক্তভোগী ইয়াসিন মোল্লা বলেন, "যমুনার ভাঙনে আমার ৮ বিঘা জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। ভুট্টা, ধান ও সবজি চাষ করে সচ্ছল জীবন কাটাতাম, এখন সব হারিয়ে আমি পথে বসে গেছি। আমাদের গোষ্ঠীর প্রায় ৬০ বিঘা জমি নদীগর্ভে চলে গেছে।"

ধীতপুর গ্রামের স্বামীপরিত্যাক্তা আন্না খাতুন জানান, গত এক বছর ধরে শিশুকন্যাকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। চার-পাঁচ দিন আগে বাবার বাড়িটি যমুনার ভাঙনের মুখে পড়লে ঘরটি সরিয়ে নেওয়া হয়। এখন ঘরের একপাশে বেড়াও নেই; কুকুর-শিয়ালের আক্রমণ থেকে বাঁচতে মাছ ধরার ঝাঁকিজাল দিয়ে ঘিরে সেখানে বসবাস করছেন তারা।

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা সারমিন জানান, ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণের চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মখলেছুর রহমান জানান, সোনাতনী ইউনিয়নটি যমুনা নদীর চরাঞ্চল এলাকা হওয়ায় সেখানে তাদের বর্তমানে কোনো প্রকল্প চালু নেই। ফলে তাৎক্ষণিক কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, তবে নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেলে সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।