কুমিল্লায় একের পর এক খুন, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির গত রোববার অনুষ্ঠিত সভার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আট মাসে জেলায় মোট ৯৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই আট মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে মে মাসে (১৭টি)। এছাড়া জানুয়ারিতে ১৪টি এবং ফেব্রুয়ারিতে ১২টি খুনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৯টি, জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি, মার্চে ১১টি, এপ্রিলে ১০টি, মে মাসে ১৭টি, জুনে ১০টি এবং জুলাইয়ে ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
একই সময়ে জেলায় ২২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া গত ছয় মাসে ৩৩৩টি চুরি, ৩৫টি ডাকাতি এবং ১৪টি অপহরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ৩৯৫টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং পুলিশ উদ্ধার করেছে ৫১টি অস্ত্র।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, কিশোর গ্যাং, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের দৌরাত্ম্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রধান কারণ। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অপরাধীদের প্রকাশ্যে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলেও বয়সের স্বল্পতা ও আইনি জটিলতার কারণে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।
এদিকে কুমিল্লা নগরীতে কিশোর গ্যাং ও অস্ত্রসহ আটক অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের ঘনিষ্ঠতার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া বুড়িচং থানার দেবপুর পুলিশ ফাঁড়িতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটকের কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নগরীর হাউজিং এস্টেট এলাকার বাসিন্দা জসিম বলেন, "প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের অলিগলিতে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। কারা তাদের পেছনে থেকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, সেটিও খুঁজে বের করা প্রয়োজন।"
কুমিল্লা মডার্ন হাই স্কুলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, "মাদকে সয়লাব কুমিল্লার অলিগলি। ছিনতাই বেড়েছে কয়েক গুণ, প্রতিদিন সাধারণ মানুষ ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে। স্কুল-কলেজকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতেও সক্রিয় রয়েছে কিশোর গ্যাং।"
বাংলাদেশ নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি ডা. আতিকুল ইসলাম বলেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সমাজের মূল্যবোধের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিনের লুটপাট ও দুর্বৃত্তায়নের ফলে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার হতে সময় লাগবে।"
কিশোর অপরাধীদের বয়স নির্ধারণের জটিলতা নিয়ে কথা বলেছেন কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুল হক রিঙ্কু। তিনি বলেন, "কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পর তাদের বয়স নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। এ ক্ষেত্রে স্কুলের সনদে উল্লেখিত বয়সকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তা না হলে আইনের ফাঁক গলে তারা বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।"
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পদক্ষেপ সম্পর্কে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার কামরুজ্জামান বলেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল দলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। গত মাসেই ১৯২ জন ছিনতাইকারীকে আটক করা হয়েছে। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।"