শ্রাবণের সজল আবহ, রবীন্দ্রসংগীতের সুর, কবিতার ছন্দ এবং নৃত্যের তালে দর্শকের সামনে ফুটে উঠেছিল ‘বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা’ নামের এই আয়োজন। জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে ঋতুভিত্তিক অনুষ্ঠানটি বর্ষার প্রকৃতি, মানবিক অনুভব ও বাঙালির চিরায়ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একসূত্রে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি–ভবন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় বর্ষাকেন্দ্রিক এই সাংস্কৃতিক পর্ব। বৃষ্টি, শ্রাবণ ও প্রকৃতিভাবনা সংশ্লিষ্ট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বর্ষার নানা মাত্রিক রূপ তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সভাপতির বক্তব্য দেন রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি কৃষ্টি হেফাজ। তিনি বলেন, ‘আমরা দর্শকদের মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য সচেষ্ট থাকি, যেন আমাদের সংস্কৃতির যে মান, তা বজায় থাকে। বাঙালির সংস্কৃতি সম্প্রীতি, পরস্পরের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা, ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির কথা বলে। আমাদের ষড়্ঋতু যেমন বৈচিত্র্যময়, সংস্কৃতিও তেমনি বৈচিত্র্যের ধারক। এই অনুষ্ঠানে বর্ষার রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।’
বক্তব্যের পর সভাপতির পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শ্রাবণসন্ধ্যা’ থেকে অংশবিশেষ পাঠ করা হয়। এরপর ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নীলাঞ্জনা চৌধুরী।
এরপর শুরু হয় গানের পর্ব। সম্মেলক কণ্ঠে ‘শ্রাবণ মেঘের আধেক দুয়ার ওই খোলা’ গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। একক ও সম্মেলক কণ্ঠের গান ছাড়াও মাঝেমধ্যে সম্মেলক গানের সঙ্গে সম্মেলক নৃত্য এবং কবিতা আবৃত্তি উপস্থাপন করা হয়।
একক কণ্ঠের পরিবেশনাগুলোর মধ্যে অভয়া দত্ত পরিবেশন করেন ‘বন্ধু রহো রহো সাথে’, সঞ্জয় বণিক গেয়ে শুনিয়েছেন, ‘বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে এসেছি’, ‘আমার কী বেদনা সে কী জানো’। দীপ্র নিশান্ত পরিবেশন করেন ‘আমার কী বেদনা সে কী জানো’। সুমা রাণী রায় গেয়েছেন ‘বাদল–দিনের প্রথম কদম ফুল’, শিমু দে পরিবেশন করেছেন ‘চিত্ত আমার হারালো’, আর ফাহিম হোসেন চৌধুরী পরিবেশন করেন ‘আমার যে দিন ভেসে গেছে’। আবৃত্তি করেন মাহমুদা আক্তার।
বৃষ্টি, মেঘ, শ্রাবণ এবং প্রকৃতির রূপমাধুর্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্ট গানগুলোর পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে এক আবেগঘন আবহ তৈরি করে। বর্ষার সৌন্দর্য, মানবমনের অনুভূতি এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক যেন প্রতিটি গানে নতুন করে ধরা দেয়।
সম্মেলক নৃত্যে ছিল ‘অম্বরে প্রচণ্ড ডম্বুর’, ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে’ ও ‘আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা’ গানগুলোর সঙ্গে। সন্ধ্যার শেষ ভাগে সম্মিলিত কণ্ঠে ‘যায় দিন শ্রাবণ দিন যায়’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘বাঁধনহারা বৃষ্টিধারা’। বর্ষার রূপ ও রবীন্দ্রসংগীতের সৌন্দর্যে ভরা এই আয়োজন দর্শকদের কাছে হয়ে ওঠে এক স্মরণীয় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।
অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও সংগীত পরিচালনায় ছিলেন মহুয়া মঞ্জরী। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন—তবলায় সুবীর ঘোষ, কি–বোর্ডে রবিন্স চৌধুরী, সেতারে শিবরাজ খান ও মন্দিরায় প্রদীপ রায়।