সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তিটি সই হয়েছে সৌদি রাজধানী রিয়াদের বদলে পবিত্র মক্কা শহরে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে তিন দেশের নেতাদের প্রার্থনার ছবি। এভাবে বার্তাটি বিশ্বজুড়ে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে আলোচনা উঠেছে।

সৌদি আরব অবশ্য দ্রুত জানিয়েছে, চুক্তিটি কোনো সম্প্রদায়ভিত্তিক বা সামরিক জোট গঠনের উদ্দেশ্যে নয়। তারপরও চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে গুঞ্জন থামছে না। বিশেষ করে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় রিয়াদ সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক অক্ষ গঠনের ঘোষণার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এক দশক আগে গঠিত ‘ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশন’ (আইএমসিটিসি) ইতিমধ্যে বহু দেশকে একটি জোটে যুক্ত করেছিল। অনেকের ভাষায় এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলেও অভিহিত করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটেই ‘মক্কা চুক্তি’ ঘিরে বিশ্লেষণ আরও বিস্তৃত হয়েছে।

এই চুক্তি এমন এক সময়ে এল, যখন কয়েকটি চলমান সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ; লেবানন, সিরিয়া এবং দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের আগ্রাসী সামরিক দখলদারত্ব ও হত্যাকাণ্ড; এবং ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদির নিজস্ব যুদ্ধ। ফলে এই মুহূর্তে নতুন কোনো সামরিক সমন্বয় কী ইঙ্গিত দিচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

তুর্কি ও পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমগুলো চুক্তি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছে। তারা নতুন মধ্যপ্রাচ্য ব্যবস্থার সম্ভাবনার কথা বলছে। তবে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে একসঙ্গে যুদ্ধ করবে এবং কার বিরুদ্ধে লড়বে—সে বিষয়গুলো এখনো স্পষ্ট নয়।

এর অভিজ্ঞতা আগে হয়েছে। ২০১৭ সালেও অনেকটা একই ধরনের আলোচনা দেখা গিয়েছিল। সে সময় পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফকে সৌদি নেতৃত্বাধীন আইএমসিটিসির প্রথম কমান্ডার করা হয়। তৎকালেও ইরান ও তার মিত্রদের মোকাবিলা করাই ছিল জোটের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—‘মক্কা চুক্তি’ কি আসলে ইরান ও তার মিত্রদের জন্য একটি সতর্কবার্তা, নাকি উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সম্ভাব্য হামলা ঠেকানোর লক্ষ্য?

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব—তিন দেশই নানাভাবে ছায়া যুদ্ধে জড়িত ছিল বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। সিরিয়া ও ইয়েমেন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের অস্থির অঞ্চল খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে এর প্রভাব দেখা গেছে। আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে এই তিন দেশের বড় ধরনের মতপার্থক্যও রয়েছে এবং তা এখনো চলমান।

এ ঘোষণার পর ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের উদ্বেগও স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। তাদের দৃষ্টিতে, এটি তাদের নিজেদেরই করা কিছু ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ নেওয়ার মতো। কয়েক মাস ধরে শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সতর্ক করে আসছিলেন যে ইরানের স্থানে একটি নতুন ‘সুন্নি’ অক্ষ গড়ে উঠতে পারে, যা ইসরায়েলের প্রধান শত্রু হয়ে উঠতে পারে।

সাবেক ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট থেকে শুরু করে সরকারের সাবেক মুখপাত্র ইলন লেভি—অনেকেই এ সম্ভাব্য হুমকির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, সৌদি ও কাতারের অর্থায়নে পাকিস্তান ও তুরস্কের অংশীদারত্ব ইসরায়েলের জন্য নতুন বিপদ ডেকে আনবে।

তুর্কি সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে গ্রিসকে এই নতুন জোটের প্রথম সম্ভাব্য লক্ষ্য বলে চিহ্নিত করছে। ভূমধ্যসাগরে গ্রিস এখন ইসরায়েলের প্রধান মিত্র। বিরোধপূর্ণ সাগরে পাকিস্তানি সামরিক শক্তির উপস্থিতি নিয়ে গ্রিস উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একে তারা তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ সামরিক প্রস্তুতির লক্ষণ হিসেবে দেখছে।

এদিকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কলাম লেখা হচ্ছে। সেখানে তুরস্ক ইসরায়েলে হামলা চালাতে পারে কিংবা নতুন ‘ইরান’ হয়ে উঠতে পারে—এমন শিরোনামধর্মী আলোচনাও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি তেহরানে পাকিস্তানি দূতাবাসের কাছে ইসরায়েলি হামলার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ একটি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইসরায়েলকে সরাসরি সতর্ক করে। অন্যদিকে ‘জেরুজালেম পোস্ট’ এক নিবন্ধে জানায়, সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে ইরানের বিষয়ে তাঁর প্রধান আস্থাভাজন ব্যক্তি বানিয়েছেন। তাঁকে ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলেও ডেকেছেন তিনি। ট্রাম্প গাজা শান্তি আলোচনাতেও পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে ইসরায়েল যে অস্বস্তি বা নারাজ মনোভাব দেখাচ্ছে—বিশেষ করে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলাকে ‘শয়তানি’ বলে পাকিস্তান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য এবং তুরস্কের সামরিক হস্তক্ষেপের পুরোনো হুমকি—তা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

ইসরায়েলের আরেক মিত্র ভারতও বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কি-পাকিস্তানি সামরিক জোটকে রুখতে তারা গ্রিসের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। তুর্কি পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে পাকিস্তানি পাইলটরা—এ নিয়েও গ্রিস প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে, সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় পাকিস্তানকে সমর্থন করায় গত বছর তুরস্কের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছিল ভারত। তবে প্রতীকী অবস্থানের বাইরে তুরস্ক বাস্তবে পাকিস্তানকে কতটা সামরিক সহায়তা দিতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। ন্যাটো সদস্য হিসেবে তুরস্কের কোনো যুদ্ধ পুরো সামরিক জোটের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ পায়।

আরেকটি বিবেচনা হলো—পাকিস্তান ও সৌদি আরব—দুই দেশই মার্কিন যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারের ক্রেতা। ওয়াশিংটন এর আগেও এসব চুক্তিতে ভেটো দিয়েছে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের কাছে তুরস্কের ৩০টি অ্যাটাক হেলিকপ্টার বিক্রি বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। অথচ এটিকে দুই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিমানচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাও বলা হয়েছিল। সে কারণে ভবিষ্যতে যেকোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কঠোর নজরদারিতে থাকবে—এ আশঙ্কা থেকেই যায়।

ইতিহাসের দিক থেকেও দেখা যায়, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের চিরন্তন যুদ্ধে সৌদি আরব প্রকাশ্যে পাকিস্তানের পক্ষে যায়নি। তারা নিজেদের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখানোর কথাই আগে এসেছে। বাস্তবতা হিসেবে ভারত সৌদির বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারদের একটি। অন্যদিকে পাকিস্তান সৌদির কাছ থেকে কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা পায়—এ ব্যবধান সম্পর্কের ধরনকে আলাদা করে।

তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যকার বিরোধেও সৌদির পক্ষ নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হয়। গত মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়ানবুর তেল শোধনাগারের দিকে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছেন সৌদিতে কর্মরত গ্রিক সামরিক সদস্যরা। এই তথ্যও আলোচনার মধ্যে এসেছে।

ফলে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়—ইসরায়েলের কথিত ভয় কিংবা সৌদির ওপর ‘ইরানি হুমকি’র বাইরে এই জোটের গুরুত্ব কতটুকু? এটি কি নিছক প্রতীকী পদক্ষেপ—শত্রুদের কাছে বার্তা দেওয়া যে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ এখন বহুমুখী রূপ নেবে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে?

ভারত, ইসরায়েল ও গ্রিস নিশ্চিতভাবেই সতর্কঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। তবে এই জোট বাস্তবে যুদ্ধের চিত্র কতটা বদলে দেবে, তা সময়ই বলে দেবে বলে মত প্রকাশ করা হচ্ছে।

  • কামাল আলম মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত