দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে তরুণেরা থাকলেও, পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় তাঁদের যথাযথ স্থান তৈরি হচ্ছে না। প্রতিবারই বিজয়ের পর ক্ষমতা প্রবীণ নেতৃত্বের হাতে চলে যাচ্ছে, যার ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তরুণেরা পিছিয়ে পড়ছেন।
আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে ‘আগামীর বাংলাদেশ: তারুণ্যের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ব্র্যাকের সহযোগিতায় মুক্তকণ্ঠ বন্ধুসভা এই আয়োজনের কথা জানায়।
আলোচনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনে তরুণেরা নেতৃত্ব দিয়েছেন; কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে, বিজয়ের পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সিনিয়রদের (প্রবীণ) হাতে ক্ষমতা চলে গেছে, তরুণদের যেতে হয়েছে ‘ব্যাকসিটে’।"\ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা তরুণদের পরিবর্তে অন্যরা দখল করে নিয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর তরুণদের নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সেখানে আংশিক বাস্তবায়ন এবং পুরোনো রাজনৈতিক রীতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মাইগ্রেশন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান বলেন, তরুণেরা বিসিএস, বড় আইএনজিও বা বিদেশ যাওয়াকে সম্মানজনক পেশা মনে করলেও কৃষি, কারিগরি শিক্ষা বা উদ্যোক্তা হওয়াকে এখনো সেভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতা উদ্যোক্তা তৈরির চালিকাশক্তি হলেও ঘন ঘন পেশা বদলের কারণে গভীর দক্ষতা অর্জনে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশ এখনো তুলনামূলকভাবে একটি তরুণ রাষ্ট্র। তাই অন্য উন্নত দেশগুলোর মতো এই রূপান্তরের জন্য কিছুটা ধৈর্য ধরা প্রয়োজন। প্রবীণ প্রজন্মের উচিত তরুণদের এই পরিবর্তন-প্রক্রিয়ায় বাধা না দেওয়া।"
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের হেড অব কমিউনিকেশনস মো. আবদুল কাইয়ুম বলেন, প্রবীণ প্রজন্মের উচিত তরুণদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজস্ব ভাষার পরিবর্তে শ্রদ্ধা ও গ্রহণযোগ্য আচরণের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করা। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে অনানুষ্ঠানিক আন্তঃপ্রজন্ম যোগাযোগ বাড়লে এই দূরত্ব কমে আসবে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, সরকারি চাকরির প্রতি তরুণদের প্রবল আকর্ষণের কারণ হিসেবে চাকরির নিরাপত্তাকে চিহ্নিত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান। তিনি বলেন, দক্ষতা হালনাগাদ না করলেও চাকরি হারানোর ঝুঁকি কম থাকায় তরুণেরা বিসিএসের প্রতি আকৃষ্ট হন। বিসিএস-কেন্দ্রিক এই মানসিকতাকে ‘স্ক্যাম’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, "রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া কোনো পেশাতেই প্রকৃত নিরাপত্তাবোধ তৈরি সম্ভব নয়।"
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন মুক্তকণ্ঠের হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশনের সভাপতি বুলবুল হাসান, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের অ্যাডভাইজার (চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়ুথ লিডারশিপ) ফাল্গুনী রেজা, ব্র্যাক ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম ও মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল কাদির, এক্সিলেন্স বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী বেনজির আবরার, বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক, নির্বাহী সভাপতি ফরহাদ হোসেন মল্লিক ও সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি। প্যানেল আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের বিতর্ক ও অনুষ্ঠান সম্পাদক কামরুল ইসলাম।
এর আগে দিনব্যাপী এক আন্তবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দল অংশ নেয়। এতে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সটাইলস ডিবেটিং ক্লাব এবং রানার্সআপ হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি। চ্যাম্পিয়ন দলের শহিদুল ইসলাম শ্রেষ্ঠ বক্তার খেতাব অর্জন করেন। আলোচনা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।