সরকার পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক সম্পর্কের উত্থান-পতন ঘটে এবং সময়ের সাথে সাথে কূটনীতির ভাষাও বদলে যায়; তবে প্রতিবেশী বদলায় না। এই চিরন্তন বাস্তবতাই পররাষ্ট্রনীতির একটি মৌলিক শিক্ষা দেয় যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের সাফল্য কেবল সংকট মোকাবিলায় নয়, বরং সংকটের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নয়াদিল্লি থেকে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য এবং তার প্রেক্ষিতে ঢাকার তীব্র প্রতিক্রিয়া, পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক বার্তা ও উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়ে জল্পনা—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এই ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়। অতীতেও এমন টানাপোড়েন দেখা গেছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার আড়ালে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও পারস্পরিক নির্ভরতার বাস্তবতা সবসময়ই বিদ্যমান থাকে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, তাৎক্ষণিক উত্তেজনা কাটিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে সুরক্ষিত হবে। এর জন্য প্রয়োজন এমন এক কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতি, যা সাময়িক উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। দুই দেশের বাস্তব পার্থক্যকে বিবেচনায় রেখে মতপার্থক্য ও সহযোগিতা—উভয়কেই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের আলোকে পরিচালনা করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি কোনো সাময়িক রাজনৈতিক ঘটনার ওপর নয়, বরং ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের মতো দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি স্থলসীমান্ত, ৫৪টি অভিন্ন নদী এবং বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা দুই দেশের মধ্যে এমন এক পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি করেছে, যা রাজনৈতিক উত্তেজনা দিয়ে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক কেবল একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে নয়, বরং এটি পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো পরস্পরসংযুক্ত স্বার্থের একটি জটিল বিন্যাস।

রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও বাস্তব সমস্যাগুলো থেকেই যায়। ২০২৬ সালে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এবং ২০১১ সাল থেকে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি অনিষ্পন্ন। প্রতি শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের মানুষ এই অচলাবস্থার প্রভাব ভোগ করছেন। সীমান্তে প্রাণহানি যেমন উদ্বেগের, তেমনি আন্তসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত সহযোগিতা অব্যাহত রাখাও দুই দেশের যৌথ স্বার্থ। এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, সাময়িক টানাপোড়েনের পরও মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে ধারাবাহিক সংলাপ ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

লেখকের মতে, "ভারতকে ঘিরে প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে একটি মৌলিক প্রশ্ন করা উচিত—এটি কি বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে শক্তিশালী করছে? প্রতিবেশীকে বদলানোর সুযোগ নেই; কিন্তু নিজের সক্ষমতা বাড়িয়ে সেই প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজের।"

অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ প্রতিবছর ১১ থেকে ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য ভারত থেকে আমদানি করলেও রপ্তানি সীমিত হয়ে আছে মাত্র ১ দশমিক ৮ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে। ভারতের পক্ষ থেকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের বাণিজ্যঘাটতি এবং অশুল্ক বাধা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ। তবে ফেনী সেতু, রেল ও নৌপথে সংযোগ এবং জ্বালানি সহযোগিতার উদ্যোগগুলো দেখায় যে দুই দেশের অর্থনীতি ক্রমেই আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছে।

জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক আকার ও সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ভারত একটি বৃহত্তর শক্তি। এই অসমতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে প্রকৃত কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো এই অসমতাকে বিচক্ষণতা ও কৌশলের সঙ্গে পরিচালনা করে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করা এবং পারস্পরিক নির্ভরতা থেকে সুফল অর্জন করা। ছোট রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কৌশলগত অবস্থান এবং দক্ষ কূটনীতির ওপর। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার বড় কৌশলগত সম্পদ। তবে এই সুবিধাকে দর-কষাকষির শক্তিতে রূপ দিতে হলে অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আবেগ বা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নয়, বরং কৌশলগত পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। এই নীতি তিনটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। প্রথমত, প্রতিটি সিদ্ধান্ত জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে শক্তিশালী করছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। পানি, বাণিজ্য ও জ্বালানির মতো বিষয়গুলো দলীয় রাজনীতির নয়, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিষয়। দ্বিতীয়ত, যৌথ নদী কমিশন বা বাণিজ্য সংলাপের মতো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলোকে নিয়মিত ও কার্যকর রাখতে হবে, যাতে রাজনৈতিক আবহাওয়া বদলালেও সহযোগিতার ভিত্তি অটুট থাকে। তৃতীয়ত, সম্পর্ককে কেবল ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার ওপর নয়, বরং নিয়মিত মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ ও কারিগরি কমিটির মতো একটি কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে।

টেকসই অংশীদারিত্বের ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা। ভারতেরও উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আস্থা কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিয়ে অর্জন করা যায় না; তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত ও জাতীয় স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীল হতে হবে। পরিণত কূটনীতির শিক্ষা হলো—একটি মতপার্থক্য যেন পুরো সম্পর্ককে ‘বন্দী’ করে না ফেলে। বাংলাদেশ সীমান্ত হত্যা বা পানিবণ্টনের মতো প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির মতো অভিন্ন স্বার্থের ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ তার ভারতনীতি নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ইন্দো-প্যাসিফিকের পরিবর্তনশীল সমীকরণের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্কের পাশাপাশি চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক বহুমুখী করা বাংলাদেশের স্বার্থে জরুরি। এর অর্থ কোনো দেশ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং কৌশলগত পরিসর বিস্তৃত করা। বিমসটেকের মতো আঞ্চলিক উদ্যোগকে কার্যকর করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করা প্রয়োজন।

সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপস না করেই একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র সাময়িক বিরোধকে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার অন্তরায় হতে দেয় না। বর্তমান উত্তেজনা একসময় ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে, কিন্তু অভিন্ন নদী, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব থেকে যাবে। তাই বাংলাদেশের ভারতনীতি সাময়িক রাজনৈতিক আবেগ বা জনতুষ্টির ওপর নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদৃষ্টি ও কৌশলগত বাস্তববাদের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।

পরিশেষে, এই সম্পর্কের সাফল্য যৌথ বিবৃতির ভাষা দিয়ে নয়, বরং এই সম্পর্ক বাংলাদেশকে কতটা নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করছে, তা দিয়ে বিচার করা হবে। পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হতে হবে বাস্তববোধ ও দূরদর্শিতা; আর কূটনীতির লক্ষ্য হবে ধৈর্য ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়া।

— গোলাম রসুল, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা।