মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তাদের দাবি, বর্তমান খসড়া আইনটি দায়মুক্তি ও অস্বীকারের সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করবে। এই আইনের ত্রুটি দূর করতে খসড়ার ১৪ ধারা সংশোধন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ডের’ বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
নতুন এই খসড়া আইনটিকে ‘গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছে এনসিপি। তাদের অভিযোগ, খসড়া আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী গুমের অভিযোগ করতে হলে থানায় যেতে হবে এবং পুলিশই সেই অভিযোগ তদন্ত করবে। অথচ খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে যে পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার এবং সরকারের গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার সদস্যরা গুমে জড়িত হতে পারে। এনসিপির মতে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে, তদন্তের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই রাখা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে। দলের দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা এই বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইন, ২০২৬ অনুমোদন করেছে। এর আগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারিকৃত গুম বিষয়ক অধ্যাদেশটি বর্তমান সরকার এপ্রিল মাসে বিলুপ্ত করে। ফলে বর্তমানে নতুন করে সংঘটিত গুমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই, তাই একটি আইন প্রণয়ন জরুরি।
এনসিপি মনে করে, সরকার অধিকতর ভালো আইনের প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রকৃতপক্ষে একটি দুর্বল আইন তৈরি করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বর্তমান খসড়া আইন অনুযায়ী কোনো পরিবার পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পুলিশই তা তদন্ত করবে। ফলে পুলিশ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে নিজেকে দায়মুক্ত দেখাতে পারবে। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী পরিবার সশ্রম কারাদণ্ডের মুখে পড়তে পারে। এতে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতে ভয় পাবেন। এনসিপির দাবি, মিথ্যা অভিযোগের বিধানটি সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হলো অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া।
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দিয়েছে। এই সনদের ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গুমের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটিও স্পষ্ট করেছে যে, কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সেই বাহিনী তদন্তে অংশ নিতে পারবে না। এনসিপির দাবি, খসড়া আইনের ১৪ ধারা এই ন্যূনতম মানও পূরণ করে না।
সরকারের প্রতি দুটি প্রধান দাবি জানিয়েছে এনসিপি। প্রথমত, খসড়া আইনের ১৪ ধারা সংশোধন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গুমের প্রতিটি অভিযোগ পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং খসড়া আইনে তালিকাভুক্ত অন্য সব বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থাকে দিয়ে তদন্ত করাতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রশিক্ষিত তদন্ত ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এনসিপি বলেছে, সরকার এপ্রিলে সেই অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত করেছে; সেই ব্যবস্থাটি ফিরিয়ে আনতে হবে। অথবা সরকার এমন একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠন করবে যেখানে পুলিশ, সামরিক, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত করার প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা ও সক্ষমতা থাকবে। বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ছাড়া এই খসড়া আইন দায়মুক্তির অবসান ঘটাবে না, বরং তা টিকিয়ে রাখবে।