বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর সাইবার ঝুঁকির যে প্রবণতা বাড়ছে, তার শিকার হয়েছে তাইওয়ান। গত জুলাই মাসে বিদেশি কোনো উৎস থেকে দেশটির সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় এআইচালিত সাইবার হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তাইওয়ান কর্তৃপক্ষ। তবে ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, আক্রান্ত সংস্থাগুলো সফলভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পেরেছে।
তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরে তাদের ভূখণ্ডে চীনের ক্রমবর্ধমান 'হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার' বা বহুমুখী যুদ্ধের অভিযোগ করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত এই দ্বীপটিকে নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে চীন রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়ে চলেছে। এই কৌশলের অংশ হিসেবে প্রতিদিন সামরিক মহড়া, ভুল তথ্য প্রচার এবং সাইবার হামলার মতো ঘটনা ঘটছে বলে মনে করা হয়।
ন্যাশনাল সিকিউরিটি ব্যুরোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর হাসপাতাল ও ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে চীনভিত্তিক সাইবার হামলা আগের বছরের তুলনায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে গড়ে প্রতিদিন ২৬ লাখ ৩০ হাজার সাইবার আক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যুরোটি আরও উল্লেখ করেছে, কিছু হ্যাকিং হামলা সামরিক মহড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে চালানো হয়েছিল।
ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ইউনিটগুলো জুলাই মাসে সরকারি সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত এই ব্যতিক্রমী আক্রমণ শনাক্ত করেছে। ২০ জুলাই থেকে পরিস্থিতি তদন্তের পাশাপাশি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সাইবার সিকিউরিটি বেশ কয়েকটি সতর্কবার্তা জারি করে।
তদন্তের ফলাফলে দেখা গেছে, এই হামলার পেছনে কোনো বিদেশি উৎসের স্পষ্ট বৈশিষ্ট্য ছিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "হ্যাকাররা প্রথাগত ম্যানুয়াল পদ্ধতির পাশাপাশি ওপেন ক্লর মতো এআই এজেন্টভিত্তিক আক্রমণ সমন্বয় করে একটি সংকর বা হাইব্রিড কৌশল ব্যবহার করেছিল।"
আক্রমণের উৎস, পদ্ধতি ও প্রভাবের পরিধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হয়েছে এবং আক্রান্ত সংস্থাগুলো পর্যায়ক্রমে তা সমাধান ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। এআই-উদ্ভূত নতুন হুমকি মোকাবিলায় সরকার প্রতিরক্ষামূলক নির্দেশিকা তৈরি করেছে এবং সিস্টেম মনিটরিং জোরদার করেছে। তবে তাইওয়ানের বিবৃতিতে সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং চীনের তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স কার্যালয়ও এই বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান 'ড্রিম' তাদের এক ব্লগ পোস্টে এআইচালিত এই হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে। ড্রিম জানায়, এশিয়ার এক অজ্ঞাত সরকারের গোপন তথ্য ও পাসওয়ার্ড চুরি করতে একটি অভিযান চালানো হয়, যেখানে এআই এজেন্টদের একটি দল যৌথভাবে কাজ করে কর্মকর্তাদের পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেয়। মাত্র চার দিনের মধ্যে তাইওয়ানের বিচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদের রেকর্ড চুরি এবং পারমাণবিক নিরাপত্তা সংস্থার দুর্বলতাগুলো স্ক্যান করা হয়। পুরো ক্যাম্পেইন পুনর্নির্মাণ করার পর ড্রিম জানতে পারে, আক্রান্ত সংস্থাগুলো ছিল তাইওয়ানের সরকারি প্রতিষ্ঠান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যানথ্রোপিকের মিথোসের মতো সর্বাধুনিক এআই মডেল বাজারে আসার পর হ্যাকারদের কাজ সহজ হয়ে গেছে। এই মডেলগুলো দ্রুত লক্ষ্যবস্তুর তথ্য সংগ্রহ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে সক্ষম।
কোড স্ক্যানিং টুল সেমগ্রেপের নিরাপত্তা গবেষক ক্রিস থমাস বলেন, "এআইনির্ভর হ্যাকাররা কত দ্রুত তাদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, এই স্পাই ক্যাম্পেইনটি তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।"
তিনি আরও জানান, এই প্রক্রিয়াটি শতভাগ স্বয়ংক্রিয় নয়। কাকে আক্রমণ করতে হবে এবং কী উদ্দেশ্যে করতে হবে, সেই নির্দেশনা দেওয়ার জন্য একজন অভিজ্ঞ মানুষের ভূমিকা থাকে; মূল নিয়ন্ত্রণে একজন দক্ষ অপারেটর থাকেন।