সোমবার দিনভর ভ্যাপসা গরমের পর সন্ধ্যার পর হঠাৎ অঝোরে বৃষ্টি নামে রাজধানীতে। অল্প সময়ের এই বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও তার চেয়েও বেশি পানি জমে। এর ফলে অফিসফেরত মানুষ, পথচারী, শিক্ষার্থী ও পরিবহনকর্মীসহ সবাই চরম দুর্ভোগের সম্মুখীন হন। অনেকের গাড়িতে পানি ঢুকে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তোলে।
প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই এবং বর্ষাকালে বৃষ্টি হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ সময় রাজধানীতে ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কয়েক দিন বৃষ্টিহীন থাকার পর এমন বৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বর্ষাকালে দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে সূর্যের তাপে মাটি ও নিচের বায়ুস্তর উষ্ণ হয়ে ওঠে। একই সময়ে বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্পের কারণে বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়। ফলে গরম ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত ওপরে উঠে বড় ও ঘন মেঘ তৈরি করে, যেখান থেকে ভারী বৃষ্টি ও বজ্রঝড় হতে পারে।
বৃষ্টির পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়, বৃষ্টি হলেই কেন ঢাকা অচল হয়ে পড়ে? এই প্রশ্নের উত্তর আবহাওয়ার তথ্যে নয়, বরং রাজধানীর পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা, খাল-নালা, ড্রেনেজ অবকাঠামো এবং সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনার মধ্যে খুঁজতে হবে। মাত্র ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি যদি গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোকে দীর্ঘ সময় পানির নিচে রাখে, তবে তা বৃষ্টির সমস্যা নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার বড় ব্যর্থতা।
ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ বিদ্যমান। অনেক খাল ও জলাধার দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে। কোথাও ড্রেন অপর্যাপ্ত, আবার কোথাও ময়লা-আবর্জনায় তা বন্ধ হয়ে আছে। এছাড়া নতুন সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণের সময় পানিনিষ্কাশনের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ পানি জমলে তা ধারণ বা দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা থাকে না।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে কিছু রাস্তার ড্রেন পরিষ্কার করা যথেষ্ট নয়। ঢাকার পানিনিষ্কাশনব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। কোন এলাকার পানি কোন খাল বা জলাধারের মাধ্যমে কোথায় যাবে, সেই পুরো জলপ্রবাহের মানচিত্র অনুযায়ী পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। দখল হওয়া খাল ও জলাধার উদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। রাজধানীর পানিনিষ্কাশন নিয়ে একাধিক সংস্থা কাজ করলেও কেবল দায়িত্ব ভাগ করে দিলে হবে না, কাজের ফলাফল দৃশ্যমান হতে হবে। কোন এলাকায় কত সময়ের মধ্যে পানি নেমে যাওয়ার কথা এবং কোথায় সমস্যা হচ্ছে—তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির মতো চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঘটনা আরও বাড়বে। তবে বৃষ্টিকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আবহাওয়া অধিদপ্তর আগাম সতর্কতা দিতে পারে, কিন্তু জলাবদ্ধতা ঠেকাতে হবে কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করাই এখন সময়ের দাবি। নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে।