পুরান ঢাকার বীনা স্মৃতি স্নানঘাট দিয়ে সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পারাপার বন্ধ করা হবে। এরপর থেকে ঘাটটি শুধুমাত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হবে। রাজধানীর বাদামতলীর ওয়াইজঘাট ও তিন ফেরিঘাটের সংলগ্ন এলাকায় এই ঘাটটি অবস্থিত।
ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোবারক হোসেন মজুমদার এই সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, "আগামীকাল পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের নেতা, ঘাটের ইজারাদার (তিন ফেরিঘাট) ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে বীনা স্মৃতি স্নানঘাট দিয়ে সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপার বন্ধ করে দেওয়া হবে।"
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে তৎকালীন ৭২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিনয় সরকার বীনা নিহত হলে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এই স্নানঘাটটি স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে এটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-পার্বণ, ধর্মীয় আচার এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা পালনের স্থানে পরিণত হয়। বিশেষ করে কারও মৃত্যু হলে স্বজনরা এখানে ধর্মীয় আচার পালন করেন, যার ফলে ঘাটটির বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এটি সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপারের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
কোতোয়ালি থানা পূজা উদ্যাপন ফ্রন্টের সভাপতি শংকর সেন জানান, ২০০৯ সালের দিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত এই ঘাটটিকে সাধারণ গোদারা ঘাটে রূপান্তর করা হয়। এরপর থেকে এখানে যাত্রী ও পণ্য পারাপার শুরু হয়। তিনি বলেন, "২০০৯ সালের দিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত ঘাটটিকে সাধারণ গোদারা ঘাটে পরিণত করেন। এরপর অন্যান্য ঘাটের মতো এখান দিয়েও যাত্রী ও পণ্য পারাপার শুরু হয়। এতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার পালনে বিঘ্ন ঘটলেও তখন ধর্মীয় প্রতিনিধিরা এর প্রতিবাদ করেননি।"
শংকর সেনের ভাষ্যমতে, সে সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন, ফলে ঘাটটির ধর্মীয় ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। তিনি আরও বলেন, "কোনো সনাতন ধর্মাবলম্বী মারা গেলে তাঁর মা, স্ত্রী বা স্বজনেরা এই ঘাটে বসে ধর্মীয় ও শেষকৃত্যের বিভিন্ন কাজ করেন। এ সময় ঘাট দিয়ে মানুষ চলাচল করলে কিংবা নৌকা ভিড়লে তাঁদের ধর্মীয় আচার পালনে বিঘ্ন ঘটে। এ কারণে ঘাটটি শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত করার দাবি জানানো হয়েছিল।"
তাঁর মতে, সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপার বন্ধ হলে ধর্মীয় পবিত্রতা বজায় রেখে আচার-অনুষ্ঠান পালনে সুবিধা হবে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র আরও জানায়, বীনা স্মৃতি স্নানঘাটটি আলাদাভাবে ইজারা দেওয়া হতো না। পাশের তিন ফেরিঘাটের ইজারাদারই এই ঘাটের পারাপার নিয়ন্ত্রণ করতেন। বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে কেরানীগঞ্জের আলম মার্কেট ঘাট থেকে মানুষ ও পণ্য সরাসরি এই ঘাটে পারাপার হতো।
ঢাকা নদীবন্দরের যুগ্ম পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোবারক হোসেন জানান, বীনা স্মৃতি ঘাটের কাছেই বিআইডব্লিউটিএর ১২০ ফুটের একটি সিঁড়িযুক্ত পন্টুন ছিল। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের পরিদর্শনের সময় পন্টুনটি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে পন্টুনটি সরিয়ে ওয়াইজঘাটের পাশে নেওয়া হয়েছে। ফলে বীনা স্মৃতি স্নানঘাট ব্যবহার না করেই পাশের অংশ দিয়ে সাধারণ মানুষ ও পণ্য পারাপার করতে পারবেন।