জামালপুর জেলার মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে না পারায় স্থানীয় শিক্ষা অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই ফল বিপর্যয়ের পর ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতি ও তদারকি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— ইসলামপুর উপজেলার কদমতলী ক্বারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বীর মাইজবাড়ী দাখিল মাদ্রাসা, সরিষাবাড়ী উপজেলার ছাপারকোনা মনিজা আবুল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বকশীগঞ্জ উপজেলার শেফালী মফিজ মহিলা মাদ্রাসা এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ ও সানন্দবাড়ী টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট।

বিশেষ করে ইসলামপুর উপজেলার কদমতলী ক্বারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ৮ জন এমপিওভুক্ত ও ৬ জন প্রক্সি শিক্ষকসহ মোট ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল মাত্র ৩ জন শিক্ষার্থী, যাদের সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। ১৪ জন শিক্ষকের উপস্থিতিতেও কেন এই ফলাফল, তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল জানান, "আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, তবুও ফেল। এবার কেন্দ্রে কোনো সুযোগ সুবিধা ছিল না, সিসি ক্যামেরা ছিল। তাই ভালোমতো ঘাড় ঘুরানোর সুযোগ পাই নাই।"

গণিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী হৃদয় বলেন, "আমাদের কেন্দ্র ছিল গোয়ালচর হাই স্কুল। ভেবেছিলাম আগের মতোই পরীক্ষা দেওয়া যাবে। কিন্তু হলে ঢুকে দেখি সিসি ক্যামেরা। গণিতে ফেল করেছি, তবে কেন করেছি বুঝতে পারছি না। আমরা খাতা পুনর্নিরীক্ষার (বোর্ড চ্যালেঞ্জ) আবেদন করব।"

শিক্ষার্থীরা সিসি ক্যামেরার কথা বললেও শিক্ষকদের দায়ী করছেন অভিভাবকেরা। সুমন মিয়া নামের এক অভিভাবক বলেন, "স্কুলে ঠিকমতো ক্লাস হয় না। শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পাঠ পায় না। শতভাগ ফেলের দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপালে হবে না। শিক্ষকেরা নিয়মিত ক্লাসে আসেন না, পড়াশোনাও করান না।"

অভিযোগ অস্বীকার করে কদমতলী ক্বারীপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ছাইফুল্লাহ বলেন, "আমাদের ৩ জন ছাত্রেরই পাস করার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটন ঘটে গেছে। ভবিষ্যতে যাতে এমন না হয়, সেজন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর থেকে আমরা প্রতিদিন অতিরিক্ত দুই ঘণ্টা করে স্পেশাল ক্লাস নেব।"

শিক্ষা ব্যবস্থার এই সংকট নিয়ে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, "পরীক্ষাকেন্দ্রে কড়াকড়ি হওয়ায় আসল সত্যটা সামনে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা শিথিল মূল্যায়ন পদ্ধতি, করোনাকালীন শিক্ষার ঘাটতি এবং ধারাবাহিক দুর্বল প্রস্তুতির ফল এখন দেখা যাচ্ছে। এই বিপর্যয় এক দিনে তৈরি হয়নি।"

সাবেক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় এবং মাদকের বিস্তারকে নেতিবাচক প্রভাবক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আরও বলেন, "পুরোনো অনেক শিক্ষকের আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি ও বর্তমান কারিকুলামের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে, যা শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে।"

এই ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে শিক্ষা প্রশাসন। ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ মো. জুবায়ের মুক্তকণ্ঠকে জানান, "বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।"

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামছুল আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৩ জন পরীক্ষা দেয় কীভাবে! নীতিগতভাবে তো এই স্কুলের এমপিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। ৩ জন পরীক্ষা দিয়ে ৩ জনই ফেল করার ঘটনায় আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাব। মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"

জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, চলতি বছর জামালপুর জেলা থেকে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৩১ হাজার ৬৩৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন, যার মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছেন ১৪ হাজার ৩১৫ জন।