বরিশালে মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে দুটি পৃথক বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরো জেলাজুড়ে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। একটি ঘটনা ঘটেছে শহরের স্পর্শকাতর আদালত চত্বরে এবং অন্যটি বাকেরগঞ্জের দুধলমৌ গ্রামের একটি বসতবাড়িতে।

বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে বরিশাল আদালত চত্বরের মূল ফটকের নিকটবর্তী জুডিশিয়াল ভবনের সামনে বিকট শব্দে একটি ককটেলসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণ ঘটে। এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও আদালতকর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পরপরই বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে। বর্তমানে পুরো আদালত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

এই ঘটনাকে পরিকল্পিত নাশকতা হিসেবে দেখছেন স্থানীয় আইনজীবীরা। বরিশাল মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দীন আহমেদ পান্না বলেন, "কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির উদ্দেশ্যে এ নাশকতার পেছনে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।"

অন্যদিকে, অ্যাডভোকেট একেএম মীর জাহিদুল কবির বলেন, "আগামী ১৬ আগস্ট বরিশালে আইনমন্ত্রীর আসার কথা রয়েছে। শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করতেই একটি মহল এ ঘটনা ঘটিয়েছে।"

বিএমপি কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ জানান, "বিস্ফোরিত বস্তুটি কী ধরনের এবং কে বা কারা সেখানে রেখেছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এতে পটকার বারুদ ব্যবহার করা হয়েছে।"

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সুশান্ত সরকার জানান, সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জানা যাবে।

এর আগে গত ৩ আগস্ট সকালে বাকেরগঞ্জের ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামের শাহ আলম হাওলাদারের বাড়িতে একটি হাতে তৈরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে শাহ আলমের স্ত্রী হনুফা বেগম, মেয়ে ইতি এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাতি ফাহিম গুরুতর দগ্ধ হন। আহতদের প্রথমে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে তিনজনকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।

বরিশালের পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান জানান, "বিস্ফোরিত বস্তুটি ছিল হাতে তৈরি বোমা। পটকার বারুদ ও পেট্রোলের সংমিশ্রণে এটি তৈরি করা হয়েছিল। এতে স্প্লিন্টার ব্যবহার করা হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, "বোমা তৈরিতে অভিজ্ঞ কেউ এ কাজের পেছনে রয়েছে।"

এই ঘটনায় জামাল হাওলাদার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করা হয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, নাশকতা কিংবা আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে কোনো চক্রান্ত রয়েছে কি না—তদন্তে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

নয় দিনের ব্যবধানে দুটি বিস্ফোরণের বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাইফ মেমন বলেন, "নয় দিনের ব্যবধানে আদালত চত্বর ও বসতবাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগের। স্পর্শকাতর স্থাপনায় এ ধরনের ঘটনা ঘটানো ব্যক্তিদের উৎস ও বোমা তৈরির কারিগরদের দ্রুত খুঁজে বের করাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান চ্যালেঞ্জ।"