উত্তরবঙ্গের একটি জেলা শহরে বেড়ে ওঠা লেখক তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে লিখেছেন, নবম শ্রেণি থেকে কলেজজীবন পর্যন্ত আসা-যাওয়ার পথে বখাটে ছেলেদের যে যন্ত্রণা তাকে সহ্য করতে হয়েছে, সেই দুঃসহ স্মৃতি তিনি আজও ভুলতে পারেননি। বিশেষ করে পিছু নেওয়া এক বখাটের বাইকের শব্দ তাকে আজও আতঙ্কিত করে। নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে দ্বাদশ শ্রেণিতে তার কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যদিও অভিভাবক ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় তিনি শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখতে পেরেছিলেন। তবে দেশের সব মেয়ের ভাগ্য তেমন নয়।

বাংলাদেশে মেয়েশিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন টিকিয়ে রাখার পথে যৌন হয়রানি একটি নীরব অভিশাপ। এর একটি অংশ ঘটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে এবং অন্য অংশটি স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে। প্রথম সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা হলেও দ্বিতীয়টি অনেক ক্ষেত্রে অদৃশ্য থেকে যায়। রাস্তায় ঘটে যাওয়া হয়রানিকে প্রায়ই ‘ইভ টিজিং’, ‘দুষ্টুমি’ কিংবা ‘ছেলেমানুষি’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু এই তথাকথিত ছেলেমানুষিই কোনো মেয়ের শিক্ষাজীবনের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী কখনো না কখনো জনসমাগমস্থলে যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন; যাঁদের মধ্যে ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ ভয়ের মধ্যে বসবাস করছেন। বিশ্বব্যাংকের আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, হয়রানির কারণে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন, ১৪ শতাংশের অনুপস্থিতি বেড়েছে এবং ২৩ শতাংশের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সহিংসতা ও হয়রানি সরাসরি শিক্ষার ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত।

শিশুবিবাহের ক্ষেত্রেও যৌন হয়রানিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা হয়রানির কারণে স্কুল ছেড়ে দেয় এবং পরিবার ‘নিরাপত্তার’ কথা ভেবে তাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হয়। অনিরাপদ স্কুলযাত্রা শুধু বাল্যবিবাহের ঝুঁকিই বাড়ায় না, বরং শ্রেণিকক্ষে মনঃসংযোগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়, যা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ও শিখনফলকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে।

সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান ভয়াবহ। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৮ হাজার ৭১৩ জনের মধ্যে শিক্ষার্থী ৭ হাজার ৩৬৪ জন—যা মোট নিহতের ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। এদের মধ্যে ৩ হাজার ৩২৮ জনের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর। অর্থাৎ স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশই যাতায়াতের পথে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার আট বছর পরও পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

লেখকের মতে, "শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ সড়ক ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধকে আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। আমাদের শিক্ষা বাজেট, শিক্ষা পরিকল্পনা ও শিক্ষার মান পরিমাপের সূচকেও তাই এই প্রশ্নগুলো রাখা জরুরি; একজন শিশু কি নিরাপদে স্কুলে পৌঁছাতে পারছে? একজন কিশোরী কি নির্ভয়ে স্কুলে যেতে পারছে? তার পরিবার কি তাকে প্রতিদিন স্কুলে পাঠাতে নিশ্চিন্ত বোধ করছে? সে কি হয়রানির শিকার হলে ন্যায়বিচার পাচ্ছে?"

শিক্ষার মানের সঙ্গে নিরাপত্তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। উপবৃত্তি, বই বা অবকাঠামোর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সমাধানের জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ‘স্কুল সেফটি জোন’ তৈরি করে গতিনিয়ন্ত্রণ, ফুটওভার, নিরাপদ পারাপার, পর্যাপ্ত আলো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ সড়কের জন্য আলাদা পরিকল্পনা এবং নিরাপদ স্কুলবাসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি মেয়েশিশুদের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। স্কুল সংলগ্ন এলাকায় হয়রানির ঘটনাকে ‘ছোট ঘটনা’ হিসেবে না দেখে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা এবং মোবাইল কোর্টের পাশাপাশি ন্যাশনাল হেল্পলাইন নম্বরগুলোর মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

পরিশেষে, শিক্ষা মানে শুধু পাঠদান নয়, বরং এটি একটি নিরাপদ স্বপ্নযাত্রা। তাই শিক্ষা, সড়ক পরিবহন, স্থানীয় সরকার এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যেন প্রতিটি শিশু সকালে স্কুলে গিয়ে নিশ্চিন্তে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে।