সূর্যগ্রহণের সময় দিনের আলো হঠাৎ করে ম্লান হয়ে যায় এবং আকাশে এক অদ্ভুত দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। চাঁদ ধীরে ধীরে সূর্যকে ঢেকে দেয়, ফলে পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় দিনের আকাশ রাতের মতো অন্ধকার হয়ে যায়। এই অসাধারণ দৃশ্য কেবল মানুষের কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং বিজ্ঞানীদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সুযোগ।
সূর্যগ্রহণ কীভাবে ঘটে, কেন সব জায়গা থেকে পূর্ণগ্রহণ দেখা যায় না, প্রাণীদের আচরণে কী পরিবর্তন আসে এবং সূর্যের কোন অংশ তখন খালি চোখে দেখা যায়, এসব বিষয়ে রয়েছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য। বিবিসির প্রতিবেদন এবং নাসার তথ্যের ভিত্তিতে সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ১১টি তথ্য তুলে ধরা হলো।
সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যের আলো পৃথিবীর কোনো অংশে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে আটকে দেয়। চাঁদের ছায়া তখন পৃথিবীর ওপর পড়ে। চাঁদ যদি সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে, তবে তাকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ বলা হয়। অন্যদিকে, সূর্যের কিছু অংশ ঢাকা পড়লে সেটি আংশিক সূর্যগ্রহণ।
চাঁদ সূর্যের তুলনায় অনেক ছোট, কিন্তু কেন এটি পুরো সূর্যকে ঢেকে দেয়? সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বড় এবং সূর্য পৃথিবী থেকে চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ দূরে। এই বিশেষ দূরত্বের কারণে পৃথিবী থেকে দুটিকে আকাশে প্রায় একই আকারের মনে হয়, ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চাঁদ সূর্যের পুরো চাকতিকে ঢেকে দিতে পারে।
সূর্যগ্রহণ মূলত চার ধরনের হতে পারে: পূর্ণ, আংশিক, বলয়গ্রাস এবং হাইব্রিড। বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের মাঝখানে অবস্থান করলেও আকাশে তার আপাত আকার সূর্যের চেয়ে সামান্য ছোট থাকে। ফলে চাঁদের চারপাশে সূর্যের উজ্জ্বল অংশ একটি বলয়ের মতো দেখা যায়, যা রিং অব ফায়ার নামে পরিচিত। হাইব্রিড গ্রহণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে একই গ্রহণকে কখনো পূর্ণ, আবার কখনো বলয়গ্রাস হিসেবে দেখা যেতে পারে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় সূর্যের করোনা দেখা যায়, যা সূর্যের সবচেয়ে বাইরের বায়ুমণ্ডল। এটি অত্যন্ত দুর্বল আলো ছড়ায়, তাই স্বাভাবিক সময়ে সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠের পাশে খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যের উজ্জ্বল চাকতি ঢেকে দেয়, ফলে চারপাশে সাদা আলোর মুকুটের মতো করোনাকে দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণের অন্যতম বড় আকর্ষণ।
করোনার তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের চেয়েও বেশি। সূর্যের দৃশ্যমান পৃষ্ঠ বা ফটোস্ফিয়ারের তাপমাত্রা প্রায় ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, অন্যদিকে করোনার তাপমাত্রা প্রায় ২০ লাখ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় দিনের আলো দ্রুত কমে যায় এবং আকাশ ভোর বা সন্ধ্যার সময়ের মতো হয়ে যায়। নাসার তথ্য অনুযায়ী, কিছু স্থানে পূর্ণগ্রহণের সময় তাপমাত্রা প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
দিনের মধ্যে হঠাৎ অন্ধকার নেমে আসায় কিছু প্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। পাখিদের অনেক সময় বাসায় ফিরে যেতে দেখা যায়, আর নিশাচর প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক সময়ের আগেই সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় আকাশ এতটাই অন্ধকার হয়ে যায় যে উজ্জ্বল কিছু নক্ষত্র ও গ্রহও দেখা যেতে পারে। তবে কোন নক্ষত্র বা গ্রহ দেখা যাবে, তা নির্ভর করে গ্রহণের সময় আকাশের অবস্থান, সময় এবং ওই মুহূর্তে কোন জ্যোতিষ্ক দিগন্তের ওপরে রয়েছে তার ওপর।
পূর্ণ সূর্যগ্রহণ খুব দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় না। একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে পূর্ণগ্রহণ সাধারণত কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়। উদাহরণ হিসেবে, ২০২৬ সালের ১২ আগস্টের পূর্ণ সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্ণগ্রহণের সময় অধিকাংশ স্থানে দুই মিনিটের কম হবে।
সূর্যগ্রহণকে বিরল ঘটনা মনে হলেও পৃথিবীতে প্রতিবছর একাধিক সূর্যগ্রহণ ঘটে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে বছরে সাধারণত দুই থেকে তিনটি সূর্যগ্রহণ হতে পারে। তবে একই জায়গা থেকে বারবার পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা অত্যন্ত বিরল।
সূর্যগ্রহণ বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা সূর্যের করোনা ও সৌরবায়ু সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
সূর্যগ্রহণের সময় খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো নিরাপদ নয়। সঠিক মানের সৌরগ্রহণ দেখার বিশেষ চশমা বা নিরাপদ সৌর পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।
আজ, ১২ আগস্ট ২০২৬, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একটি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। এর পূর্ণতার পথ গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন এবং উত্তর-পশ্চিম পর্তুগালের একটি ছোট অংশের ওপর দিয়ে গেছে। উত্তর গোলার্ধের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আংশিক গ্রহণ দেখা যাচ্ছে।