গত ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধের বার্ষিকী নীরবেই পার হয়ে গেল। দিনটি নিয়ে তেমন আলোচনা চোখে পড়ল না। বিষয়টি ভাবিয়ে তোলে, কারণ পলাশীর সেই পরাজয় আজও বাংলাদেশের মানুষের জন্য গভীর শিক্ষার সূত্র হয়ে আছে।
আরও অনেক জাতি নিজেদের ইতিহাসের মোড় ঘুরে দেওয়া ঘটনাকে সহজে বিস্মৃত করে না। চীনের উদাহরণ ধরা যায়। ১৮৬০ সালে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ও ফরাসি বাহিনী বেইজিংয়ের অদূরে চীনের ঐতিহাসিক রাজপ্রাসাদ লুট করে পুড়িয়ে দেয়। অথচ সেই দেশ অতীতকে ঝলমলে করে পুনর্গঠনের পথে না গিয়ে ধ্বংসস্তূপকে যেমন ছিল তেমনই রেখে দিয়েছে। ভাঙা মার্বেলের স্তম্ভ কিংবা ছড়িয়ে থাকা পাথর সরায়নি। উদ্দেশ্য—ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন সেই অপমানকে ভুলে না যায়; তারা যেন বুঝতে পারে বিভাজন ও দুর্বলতার শেষ পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে।
.ইতিহাসের সঙ্গে কষ্টের এক অদ্ভুত যোগ আছে। চীনের রাজপ্রাসাদ যেটি ব্রিটিশদের হাতে পুড়েছিল, ব্রিটিশ শক্তির উত্থান শুরু হয়েছিল আমাদের পলাশীর যুদ্ধ থেকেই। মাত্র শ বছরের মধ্যে তারা বাংলা থেকে বেইজিং পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করে। অথচ দুঃখের বিষয়, আমাদের কাছে পলাশী এক সাধারণ তারিখে পরিণত হয়েছে—যেটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা ছাড়াই চলে যায়।
১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে দুটি সেনাবাহিনী মুখোমুখি হয়। এক পক্ষ দাঁড়িয়ে ছিল এক ঐতিহাসিক উত্থানের সূচনালগ্নে; অন্য পক্ষের জন্য শুরু হয় এমন এক অবক্ষয়, প্রায় তিন শতাব্দী পেরিয়েও যার পূর্ণ প্রতিকার আজও হয়নি।
সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে ক্ষমতায় বসেন, বয়স তখন তেইশ-চব্বিশের বেশি নয়; তাঁর নানা আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর। কিন্তু যে কাঠামোর তিনি উত্তরাধিকারী হন, তা ভেতর থেকে জীর্ণ—বাংলার ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গিয়ে যে ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছিল।
.অন্যদিকে সাগরের ওপারে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তখন জেনে ফেলেছে কীভাবে কার্যকরভাবে শাসন করতে হয়, কীভাবে অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় বিরোধ সামাল দিতে হয়, আর একই সঙ্গে পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়। একজন ব্যক্তির ভঙ্গুর কর্তৃত্ব আর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্রশক্তির মধ্যে এই মৌলিক পার্থক্য সম্ভবত পলাশীর মাঠে চূড়ান্ত মীমাংসার আগেই লড়াইয়ের ফলাফল অনেকখানি নির্ধারণ করে দেয়।
এই উত্থান-পতন যুদ্ধের আগে-পরের ঘটনাপ্রবাহেও ধরা পড়ে। পলাশীর আগের বছর, ১৭৫৬ সালে, সিরাজ নিজেই কলকাতা দখল করে ফোর্ট উইলিয়ামের পতন ঘটান এক চূড়ান্ত বিজয়ে। কিন্তু সেই আঘাত সামলে ইংরেজরা অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ফিরে আসে—কলকাতা পুনর্দখল করে, এবং তাদের অগ্রযাত্রা পৌঁছে যায় বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে দুয়ারে।
বিপরীতে, পলাশীর পরে বাংলার নতুন নবাব মীর কাসিম আগের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের সেনাবাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজান। রাজধানী সরিয়ে দেন ইংরেজদের নাগালের বাইরে মুঙ্গেরে—এবং আরও একবার ইংরেজদের চ্যালেঞ্জ করেন। কিন্তু ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে তিনি আরও চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। একটি ব্যবস্থা প্রতিটি আঘাতের পর আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে; অন্যটি বারবার চেষ্টা করেও কেবল আরও গভীরে তলিয়ে যায়।
.পলাশীকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচারণার কারণ খুঁজতে গিয়ে একটি প্রচলিত গল্প সামনে আসে। কথিত আছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক ইংরেজ সেনা কর্মকর্তা নাকি মন্তব্য করেছিলেন, যুদ্ধের মাঠের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামবাসীরা যদি কেবল তাদের হাতের লাঠিসোঁটা নিয়েও কোম্পানির বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, তাহলেই ঔপনিবেশিক সেই সেনাদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত।
কিন্তু বাস্তবে তারা নীরব দর্শক হয়ে সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। কোম্পানির শাসন যে কী ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনবে, বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে তখন তা তখনও স্পষ্ট ছিল না। তবে ২০২৬ সালে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রশ্ন হিসেবে মনে দাঁড়ায়—রাষ্ট্র কি সত্যিই তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করতে পারছে? যে জনগণ রাষ্ট্রকে নিজের বলে অনুভব করে না, সংকটের মুহূর্তে তারা আবারও সেই সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব দর্শক হয়েই থাকে কি না—এটাই বড় প্রশ্ন।
যুদ্ধের শুরু হয় দুই বাহিনীর কামান বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। এরপর নামতে থাকে টানা বৃষ্টি। বাংলার সেনাবাহিনী বৃষ্টির সময় বারুদের ভান্ডার ঢেকে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। ফলে বৃষ্টি থামার পর তারা আর কামানের গোলা ছুড়তে পারেনি—এবং অনেকখানি কৌশলগত সুবিধা হারায়। অন্যদিকে কোম্পানির বাহিনী তাদের কামান ও বারুদ ঢেকে রেখেছিল। এখান থেকেও আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে—ঝুঁকি আগেভাগে আঁচ করা এবং সময়মতো বিচক্ষণ সতর্কতা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা কি আজ আগের চেয়ে দক্ষ হয়ে উঠতে পেরেছি?
.২৬৯ বছর আগে বাংলার নবাব এবং বাংলার সেনাবাহিনী যেদিন পলাশীর সেই আম্রকাননে পা রেখেছিল, এই ভূখণ্ড তখন ছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ আর সফল এক জনপদ। সেই গাছের সারির ভেতরে একবার ঢুকে পড়ে আমরা যেন আর কখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি। সব প্রশ্নের শেষে তাই একটিমাত্র প্রশ্ন থেকে যায়, কবে আমরা পলাশীর ছায়া থেকে বের হয়ে আসতে পারব?.
ইতিহাস লেখেন বিজয়ীরা। কোম্পানির ইতিহাসবিদ ও তাদের সুবিধাভোগীরা প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন সিরাজকে এমন এক তরুণ, অনভিজ্ঞ নবাব হিসেবে তুলে ধরতে, যিনি যেন ঘুমের ঘোরে পলাশীর সামরিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের উত্তপ্ত মুহূর্তে চারপাশে ষড়যন্ত্রের জাল আঁটসাঁট হয়ে উঠতে দেখে মরিয়া সিরাজ নিজের মুকুট মাটিতে ছুড়ে দিয়ে তাঁর সেনাপতিদের ওয়াদা চাইেছিলেন—যাতে বাংলার মুকুট হাতছাড়া না হয়।
মীর জাফর মুখে আনুগত্যের মিথ্যা আশ্বাস দেন, অথচ তাঁর মন তখন বাঁধা পড়ে শত্রুশিবিরে। এতে বোঝা যায়, সিরাজ নিজের চারপাশে বিছানো ষড়যন্ত্রের জাল ও আসন্ন বিপদের বিষয়ে ভালোভাবেই সচেতন ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে তিনি সময়মতো নিজেকে ও নিজের রাজ্যকে সেই ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত করতে পারেননি।
যে সেনাপতির ওপর তাঁর সবচেয়ে বেশি ভরসা থাকার কথা ছিল, সেই মীর জাফরই যুদ্ধের মাঠে বিপুল বাহিনী নিয়ে নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকেন। বাংলা ভাষায় ‘মীর জাফর’ শব্দটি আজও বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক হয়ে টিকে আছে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বহু নেতাও ঠিক একইভাবে তাঁদের সবচেয়ে বিশ্বস্তজনদের হাতে প্রতারিত হয়েছেন—এ অভিযোগের পক্ষে ইতিহাসের অভিজ্ঞতা যেন নিজেই ইঙ্গিত করে।
.পলাশীর বিশ্বাসঘাতকতা কোনো একজন মানুষের একক কীর্তি ছিল না। মীর জাফরের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল আস্ত একটি চক্র। ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রভাবশালী মহাজন পরিবার জগৎ শেঠরা তরুণ নবাবের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন; উমিচাঁদের মতো বণিক আর দরবারের অসন্তুষ্ট অভিজাতেরা প্রত্যেকে কষছিলেন নিজের নিজের হিসাব।
এমনকি সিরাজের আপন খালা ঘসেটি বেগমও ভাগনের বিরুদ্ধে বিছানো এই ষড়যন্ত্রের আবহে শামিল ছিলেন—সেদিন রক্তের সম্পর্কও বিশ্বাসঘাতকতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সে ক্ষেত্রে সিরাজের প্রকৃত পরাজয়টি হয়তো পলাশীর মাঠে নয়; ঘটেছিল তাঁর নিজের দরবারেই, যেখানে তিনি নিজের চারপাশের স্বার্থের জোটটিকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
রবার্ট ক্লাইভ বাংলাকে যতটা না যুদ্ধে জয় করেছিলেন, তার চেয়ে বেশি কিনে নিয়েছিলেন সেই মানুষগুলোর কাছ থেকে, যাঁদের বাংলাকে রক্ষা করার দায়িত্ব ছিল। সম্ভবত এখানেই লুকিয়ে আছে পলাশীর সবচেয়ে গভীর শিক্ষা। কোনো বিদেশি শক্তি সাধারণত কেবল নিজের শক্তির জোরে একটি জাতিকে পরাভূত করে না; যতক্ষণ না ক্ষমতার অন্দরমহলের কেউ সেই বিদেশি শক্তিকে সাদরে ডেকে আনে।
.অতএব, প্রশ্নটা দাঁড়ায়—আপনি কখন ‘যথার্থ ব্রিটিশ’ হতে পারবেন? অনভিজ্ঞ শাসকেরা প্রায়ই সিংহাসনকেই কর্তৃত্ব বলে ভুল করেন; তারা ভুলে যান আনুগত্য প্রতিদিন নতুন করে অর্জন করে নিতে হয়। আমাদের জন্য প্রশ্নও এখানেই—ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই আমরা কি তা চিনে নিতে শিখেছি, নাকি আজও মীর জাফরদের চিনতে পারি কেবল মুকুট হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর?
তবে পলাশীর পুরো সত্য অন্ধকার নয়। বিশ্বাসঘাতকতার পাশাপাশি সেদিন দাঁড়িয়ে ছিল আনুগত্য ও আত্মত্যাগও। নবাবের কামান-বাহিনীর প্রধান সেনাপতি মীর মদন শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত নবাবের পক্ষেই লড়ে গেছেন—প্রাণ দিয়েছেন যুদ্ধের মাঠে কামানের গোলার আঘাতে; তাঁর পাশে ছিলেন মোহনলালের মতো বিশ্বস্ত সেনানায়ক, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন।
আবার পরাজয় আর মৃত্যুর পরেও সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নিসা বেগম আজীবন তাঁর স্বামীর স্মৃতির প্রতি অবিচল থেকেছেন। মীর জাফরের নাম আমরা ঘৃণাভরে উচ্চারণ করি; কিন্তু ইতিহাস যেন এই মানুষগুলোর কথাও সমান যত্নে মনে রাখে—যাঁরা সব হারিয়ে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত জেনেও বিশ্বাসের পক্ষেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।
২৬৯ বছর আগে বাংলার নবাব এবং বাংলার সেনাবাহিনী যেদিন পলাশীর সেই আম্রকাননে পা রেখেছিল, এই ভূখণ্ড তখন ছিল পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ আর সফল এক জনপদ। সেই গাছের সারির ভেতরে একবার ঢুকে পড়ে আমরা যেন আর কখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারিনি। সব প্রশ্নের শেষে তাই একটিমাত্র প্রশ্ন থেকে যায়, কবে আমরা পলাশীর ছায়া থেকে বের হয়ে আসতে পারব?
এহতেশামুল হক ওয়াশিংটন ডিসিতে আইনজীবী এবং কোম্পানি আইনের খণ্ডকালীন অধ্যাপক।
মতামত লেখকের নিজস্ব