শিশুর উচ্চতা কতটা হবে, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করে বংশগত বৈশিষ্ট্যের ওপর। তবে বেড়ে ওঠার সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব থাকলে শিশু তার স্বাভাবিক বৃদ্ধির সম্ভাবনা অনুযায়ী বেড়ে উঠতে নাও পারে। তাই শিশুর উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবারের ওপর নির্ভর না করে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, আয়রন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।
শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও হাড়ের বিকাশে সহায়ক বেশ কিছু খাবারের কথা বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো খাবারই শিশুকে তার জেনেটিক সম্ভাবনার চেয়ে বেশি লম্বা করে দিতে পারে না। সঠিক পুষ্টি মূলত শিশুকে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করে দেয়।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
দুধ, টক দই ও পনির ক্যালসিয়ামের চমৎকার উৎস। শিশুর হাড় শক্তিশালী করতে ক্যালসিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুধে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ফসফরাস ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও থাকে। যেসব শিশু দুধ খেতে চায় না, তাদের বিকল্প হিসেবে টক দই বা পনির দেওয়া যেতে পারে।
ডিম
ডিম উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২ এবং আরও কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টির উৎস। প্রোটিন শিশুর হাড়, পেশি ও অন্যান্য টিস্যুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুর বয়স অনুযায়ী রান্না করা ডিম নাস্তা বা দিনের অন্য কোনো খাবারের সঙ্গে দেওয়া যেতে পারে।
মাছ
প্রোটিনের পাশাপাশি মাছ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পুষ্টির উৎস। চর্বিযুক্ত মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়, যা শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের রুই, কাতলা ও ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ সহজেই খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। তবে শিশুকে মাছ খাওয়ানোর সময় কাঁটা বেছে দেওয়ার বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
ডাল ও ছোলা
শিশুর প্রোটিনের চাহিদা কেবল মাছ, মাংস বা ডিম থেকেই পূরণ করতে হবে এমন নয়। মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, রাজমা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবারে প্রচুর প্রোটিন ও আয়রন থাকে। প্রতিদিনের ভাতের সঙ্গে ডাল রাখা একটি সহজ ও পুষ্টিকর অভ্যাস হতে পারে।
শাকসবজি
পালংশাক, অন্যান্য সবুজ শাক, গাজর, মিষ্টি আলু, কুমড়া ও বিভিন্ন সবজিতে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ থাকে। ভিটামিন এ কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, বিভিন্ন ফল ও সবজিতে থাকা ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, যা হাড় ও শরীরের টিস্যুর জন্য অপরিহার্য। শিশু শাকসবজি খেতে না চাইলে তা ডাল, খিচুড়ি বা ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
ফল
কলা, কমলা, পেয়ারা, পেঁপে ও অন্যান্য মৌসুমি ফল শিশুর খাদ্যতালিকায় রাখা বাঞ্ছনীয়। ফলে থাকা ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। প্রতিদিন একই ফল না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল খাওয়ানো ভালো।
বাদাম ও বীজ
কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, চিনাবাদাম, তিসি ও কুমড়ার বীজে স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন ও বিভিন্ন খনিজ পাওয়া যায়। তবে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে গোটা বাদাম শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই বয়স অনুযায়ী বাদাম গুঁড়া বা মিহি করে দেওয়া নিরাপদ।
ভিটামিন ডি-এর গুরুত্ব
শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য ভিটামিন ডি প্রয়োজন। চর্বিযুক্ত মাছ, ডিমের কুসুম এবং ভিটামিন ডি যুক্ত খাবার এর অন্যতম উৎস। শিশুর ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি আছে বলে সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন ছাড়া নিজের সিদ্ধান্তে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট দেওয়া ঠিক নয়।
উচ্চতা ও শারীরিক বৃদ্ধি
শিশুর উচ্চতা নির্ধারণে জেনেটিক বৈশিষ্ট্য প্রধান ভূমিকা পালন করলেও পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড ও পর্যাপ্ত ঘুম স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। শিশুর নিয়মিত খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কম রাখা উচিত। কোমল পানীয় বা প্যাকেটজাত খাবার পুষ্টির ভালো উৎস নয়।
চিকিৎসকের পরামর্শ
শিশুর উচ্চতা বা ওজন বয়স অনুযায়ী বাড়ছে না বলে মনে হলে বা সমবয়সী শিশুদের তুলনায় বৃদ্ধি অনেক ধীর হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসক শিশুর বয়স, উচ্চতা, ওজন এবং সময়ের সঙ্গে তার বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা দেখে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন করতে পারেন।
শিশুর উচ্চতা বাড়ানোর জন্য কোনো জাদুকরি খাবার নেই। দুধ, ডিম, মাছ, ডাল, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও পূর্ণ শস্যের মতো পুষ্টিকর খাবারের বৈচিত্র্যই গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পুষ্টি শিশুকে জেনেটিক সীমার চেয়ে বেশি লম্বা করতে পারে না, তবে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও হাড়ের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি করতে পারে।