সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুর কাজ আট বছরেও শেষ হয়নি। সেতুটির নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৫ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশামতো এগোয়নি।
এ সেতু নির্মাণে প্রাথমিকভাবে সময় ধরা হয়েছিল আড়াই বছর। কিন্তু সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে চার বছর ধরে “আগামী জুনে” কাজ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও পরে তা আরও পিছিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা এখন বলছেন, লক্ষ্য ২০২৮ সালের জুন মাস। ফলে জুন আসে জুন যায়—তারপরও সেতুর কাজ আর শেষ হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে এলাকাজুড়ে।
‘শাহ আরেফিন (রহ.)-অদ্বৈত মহাপ্রভু মৈত্রী সেতু’ নামে পরিচিত এই সেতুর এক পাড়ে বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি এবং অন্য পাড়ে বিন্নাকুলী গ্রাম। ৭৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি শেষ হলে এটি হবে জেলার দীর্ঘতম সেতু বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন। সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চে।
সর্বশেষ গত ১৯ মে রাতে সেতুর কাজ চলাকালে পাঁচটি গার্ডার নদীতে ভেঙে পড়ে বলে জানা গেছে। এরপর থেকে কাজ বন্ধ আছে।
সেতুর ৩০ ভাগ কাজ এখনো বাকি আছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। গত শনিবার তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, পুরোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে এবং বাকি কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, চলতি মাসেই দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং বাকি কাজ শেষ হতে আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে।
সেতুর পুরোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। বাকি কাজের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। চলতি মাসেই দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বাকি কাজ শেষ হতে আরও দুই বছর সময় লাগতে পারে।মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, সহকারী প্রকৌশলী, এলজিইডি, সুনামগঞ্জ
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংস্কৃতিকর্মী অমিয় হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, ‘সামনের জুন করতে করতে তো আট বছর গেল। এখন আরও দুই বছর সময় লাগবে বলা হচ্ছে। এই দুই বছরেও কাজ শেষ হবে কি না, আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। একটি সেতুর কাজ নিয়ে এমন টালবাহানায় এলাকাবাসী হতাশ।’
এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী, সেতুটি নির্মাণে নির্মাণকাজের সময়সীমা ছিল ৩০ মাস। সেই অনুযায়ী ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছিল তমা কনস্ট্রাকশন। এ পর্যন্ত সেতুর ১৫টি পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। ৭৫টি গার্ডারের মধ্যে ৫৩টি এবং ১৫টি স্ল্যাবের মধ্যে ১০টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজে গাফিলতি করছিল। করোনা, বন্যা, কখনো নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, যাতায়াতের সমস্যাসহ নানা অজুহাতে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে তারা দাবি করেছেন। এলজিইডির পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও কাজ এগোয়নি বলেও অভিযোগ আছে। গত বছরের জুনে কাজ ফেলে চলে যায় তমা কনস্ট্রাকশন; পরে আবার আনা হয়। সর্বশেষ গত মে মাসে গার্ডার ভেঙে পড়ার পর ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া হয়।
সেতুর ধীরগতি ও গাফিলতির প্রতিবাদে এলাকায় মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে বলে জানান স্থানীয় ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা মুক্তকণ্ঠকে। তিনি বলেন, এই সড়ক দিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলা মধ্যনগর হয়ে নেত্রকোনা জেলা সদরের সঙ্গে তথা ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ইতিমধ্যে মধ্যনগরের মহিষখলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলেও সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় ভোগান্তি রয়েই গেছে।
সেতুটি হলে পর্যটকদের পাশাপাশি জেলার বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার মানুষের যাতায়াতে ব্যাপক সুবিধা হবে। পর্যটকদের আনাগোনা আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ-১ আসনের (তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, ‘একটি সেতুর জন্য এলাকাবাসী আর কত দিন অপেক্ষা করবে? নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ করে দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছি।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলের জানা গেছে, যাদুকাটা নদীর তীরেই শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানা ও পাশের সবগ্রামে শ্রীশ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর জন্মস্থান। এর পাশেই রয়েছে একটি সীমান্ত হাট। নদীর পশ্চিম তীরে দেশের সবচেয়ে বড় শিমুলবাগান ও নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বারিক টিলা। এর পাশে টাঙ্গুয়ার হাওর, লাকমাছড়া, শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রি লেক), টেকেরঘাট এলাকায় প্রতিদিন হাজারো পর্যটক আসেন। সীমান্ত এলাকায় বগছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী শুল্কস্টেশন রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ শহর থেকে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন এসব এলাকায় যাতায়াত করেন।
বিন্নাকুলি গ্রামের বাসিন্দা তানভীর আহমদ বলেন, তাহিরপুর সীমান্ত এলাকায় বর্তমানে বহু মানুষের যাতায়াত। যাদুকাটা নদীর খেয়া পারাপারে প্রায় প্রতিবছর দুর্ঘটনা ঘটে, মানুষ মারা যায়—তার ভাষ্য। তিনি জানান, সেতু চালু হলে তিনটি উপজেলার মানুষ উপকৃত হবেন, তবে গত আট বছরেও কাজ শেষ না হওয়ায় মানুষ হতাশ।