বিশ্বকাপ ট্রফির রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও ইউরোপের ক্লাব ফুটবল ফিরে আসছে পরিচিত তীব্রতায়। ২০২৬-২৭ মৌসুম শুরুর আগে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে ঠিক কী পরিবর্তন এসেছে—ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সে শিরোপার দাবিদারই বা কারা—এ নিয়ে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক আয়োজন। আজ থাকছে জার্মানির বুন্দেসলিগা।

বুন্দেসলিগার সব আলোচনা কার্যত শুরু হয় বায়ার্ন মিউনিখকে ঘিরেই, আর শেষ হয় তাদের উৎসবেই। বর্তমান চ্যাম্পিয়নও তারাই; সর্বশেষ ১৪ মৌসুমে ১৩ বার লিগের ট্রফি গেছে বায়ার্নের ঘরে। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে যদি কোনোটা সত্যিকারের ‘এক ঘোড়ার রেস’ হয়ে থাকে, সেটা মূলত বুন্দেসলিগাই। এবারও ধারাবাহিকতা ভাঙবে—এমন আশ্বাস নেই।

তবু ফেবারিট ইন্টার থাকছে হিসাবের ভেতরে, একই সঙ্গে লড়াইয়ের মঞ্চে থাকবে নাপোলি, মিলান ও জুভেন্টাসও।

গত মৌসুমে চার ম্যাচ হাতে রেখেই শিরোপা নিশ্চিত করে ফেলেছিল বায়ার্ন। দলের ১২২ গোলের ৩৬টি একাই করেছিলেন হ্যারি কেইন। তবে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখার নিজস্ব একটা চাপও থাকে—যেটা সামলাতে গিয়ে দলের ওপর বাড়তি প্রত্যাশার বোঝা চেপে বসে। বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানিও জানেন, মিউনিখে ট্রফি জেতা কোনো বিশেষ কৃতিত্ব নয়; বরং এটা এক অলিখিত দায়িত্ব। তাই চ্যালেঞ্জ কেবল শিরোপা ধরে রাখা নয়। চ্যাম্পিয়নস লিগ ও ঘরোয়া ফুটবলের ক্লান্তি সামলে ছন্দ ঠিক রাখা—এইটাই বায়ার্নের বড় পরীক্ষা।

কেইনের শিকারি চোখ, মাইকেল ওলিসের গতি এবং দূরদর্শী পাস—আর ড্রেসিংরুমের অভিজ্ঞতায় বায়ার্ন পরীক্ষায় ভালোভাবেই টিকে যেতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ব্যস্ত সূচির পর ক্লান্তি যদি প্রভাব ফেলে, আর মৌসুম শুরুর দিকেই কয়েক পয়েন্ট হাতছাড়া হয়, তাহলে রাজত্ব টলে উঠতে সময় লাগবে না।

ব্যবধান কমিয়ে বায়ার্নকে নিচে টেনে নামাতে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড, বায়ার লেভারকুসেন ও লাইপজিগ তৈরি হচ্ছে। এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা ডর্টমুন্ডকে ঘিরেই। প্রাক্‌-মৌসুম প্রস্তুতি দেখে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে ডর্টমুন্ডের স্কোয়াড এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। দলবদলে আরও কিছু সংযোজন আসতে পারে। বিশ্বকাপ পর্বের পর চোট এবং খেলোয়াড়দের দেরিতে ফেরার কারণে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারকে শুরু থেকেই পাচ্ছেন না ডর্টমুন্ড কোচ নিকো কোভাচ। ডর্টমুন্ডের বড় চ্যালেঞ্জ হবে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা—বিশেষ করে বড় ম্যাচ জিতলেও মাঝামাঝি দলগুলোর বিপক্ষে সমস্যা দেখা দেওয়ার কথাই বেশি শোনা যায়। সেখানে একটু ঢিল কিংবা ভুলের কারণে পয়েন্ট হারানোর অভ্যাসও দলের বিপক্ষে অবস্থান তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে লেভারকুসেনকে আর আগের মতো ক্ষণস্থায়ী চমক হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এখন তাদের বলা যায় জার্মানির প্রতিষ্ঠিত শক্তি হিসেবে। সর্বশেষ ১৪ মৌসুমে বায়ার্নের বাইরে একবার চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছে তারাই। তবে এবার আর জাবি আলোনসো নেই—ডাগআউটে কার্সেল মার্তিনেজ নভেল। লেভারকুসেনের বড় শক্তি তাদের ফুটবল কাঠামো—যা বেশ দৃঢ়। পাশাপাশি তাদের খেলার ধরন দ্রুত বুঝে নিতে পারে—এমন খেলোয়াড় খুঁজে বের করার ক্ষমতাও আছে লেভারকুসেনের।

একই ধরনের প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামবে লাইপজিগও। প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলার গতি ও ধার দুটোই আছে তাদের। কিন্তু পুরো মৌসুম ধরে শিরোপার দাবিদার হিসেবে টিকে থাকার মতো ধারাবাহিকতা সব সময় চোখে পড়েনি। বায়ার্ন কিংবা ডর্টমুন্ডের পয়েন্ট কেড়ে নিয়ে শিরোপা লড়াইয়ে কিছুটা জমিয়ে তোলার সামর্থ্য আছে লেভারকুসেন ও লাইপজিগের। তবে তারা যে নিজেরাই শিরোপার দাবিদার হয়ে উঠবে—সেটি নিশ্চিত নয়।

জার্মান দলগুলোর মধ্যে সাধারণত দেখা যায় হাই-প্রেসিং ফুটবল। দ্রুত বল সামনে বাড়ানো এবং আক্রমণে অনেক ফুটবলার তুলে ধরা—দর্শকের চোখে এগুলোই আকর্ষণ বাড়ায়। তবে এই পদ্ধতিতে রক্ষণে জায়গা তৈরি হতে পারে, আর তা কাউন্টার অ্যাটাকের পথ খুলে দিতে পারে। জার্মান ফুটবলের বড় আবেদন আরও আছে গোলবন্যা ও সমর্থকদের উন্মাদনায়। গত ২০২৫-২৬ মৌসুমে ২৯৭টি ম্যাচে হয়েছিল ৯৫৭টি গোল। ম্যাচপ্রতি গোল ছিল ৩টির বেশি।

নতুন মৌসুমেও এই আক্রমণাত্মক ধারা থাকার ইঙ্গিত আছে। গোল হবে, গ্যালারি গর্জে উঠবে—আর হঠাৎ হঠাৎ করে ম্যাচের চিত্র পাল্টে যেতে পারে চোখের সামনেই। বায়ার্নের সামনে আবারও দাঁড়াবে সবাই: কেউ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে, কেউ পাশে থাকবে ছায়ার মতো, কেউ হয়তো এক-দুই সপ্তাহের জন্য শিরোপার স্বপ্ন দেখবে। তবে আগামী বছরের মে মাসের কোনো এক সপ্তাহে হয়তো আবারও শিরোপা-উৎসব মিউনিখেই হবে।