নীলফামারীর ডোমার উপজেলার কঞ্চনা বিলের মাটি তার অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত। সাধারণ মাটির মতো মনে হলেও এই মাটি পানিতে ভেসে থাকে এবং আগুনে দিলে জ্বলে ওঠে। স্থানীয়দের কাছে দীর্ঘদিনের পরিচিত এই মাটি মশা তাড়াতে কয়েলের বিকল্প হিসেবে এবং শীতকালে উষ্ণতার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে অপরিকল্পিত মাটি উত্তোলন, জলাভূমি সংকুচিত হওয়া এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে এখন অস্তিত্বের সংকটে এই প্রাকৃতিক বিস্ময়।
ডোমার উপজেলার হরিণচড়া ইউনিয়নে অবস্থিত কঞ্চনা বিলের বিশালতা এখন আর আগের মতো নেই। বছরের পর বছর জমি ভরাট ও দখলের ফলে বিলটির আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বর্ষাকালে বিলের পানির সঙ্গে এই কালচে মাটি ভেসে ওঠে, আর শুকনো মৌসুমে তা তলদেশে চলে যায়।
বিলপাড়ের বাসিন্দা রবিউল ইসলাম জানান, কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এই বিলের সঙ্গে পরিচিত। তিনি বলেন, “আগে আমরা এই বিলে মাছ ধরেছি। পানির ওপরে তেলের মতো কিছু ভেসে থাকত। আগুন নিয়্যা একটু নিচের দিকে গেলে ভেসে থাকা মাটির ওপরে হঠাৎ আগুন ধরে যেত।”
স্থানীয় যুবক রায়হান সবুক্তগীন বলেন, “খুবই অদ্ভুত ধরনের এখানকার মাটি। এগুলো পানিতেও ভাসে, আবার আগুনেও জ্বলে। অনেকে মশার কয়েলের মতো ব্যবহার করেন। শীতের সময় শুকনো মাটি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তাপও নেন।”
স্থানীয়দের দাবি, মাছ চাষের জন্য প্রতিবছর বিলের ওপরের মাটি সরিয়ে ফেলা হয়, যা পরিবেশের ক্ষতি করছে। এছাড়া বিলের অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের মাটি সংগ্রহ করে বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। রায়হান জানান, কৌতূহলবশত তিনি মৃত্তিকা পরীক্ষাগারে এই মাটির নমুনা পরীক্ষা করিয়েছেন। পরীক্ষায় মাটিতে উচ্চমাত্রার জৈব পদার্থের পাশাপাশি নাইট্রোজেন, সালফার ও জিংকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
কঞ্চনা বিলের আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো এর ভেতরের চোরাবালি, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘ভূল’ বলা হয়। বিলের কিছু অংশে এমন জায়গা রয়েছে যেখানে মানুষ বা গবাদিপশু আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, ফলে অপরিচিতদের জন্য এটি বিপজ্জনক হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন এলাকা পরিদর্শন করলেও এই মাটি ও বিল সংরক্ষণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাদের আশঙ্কা, এখনই উদ্যোগ না নিলে বাইরের লোকজন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিশেষ মাটি বিল থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকের আগে কঞ্চনা বিলে খাস খতিয়ানে প্রায় ৮৪ বিঘা জলাভূমি ছিল। ১৯৯০ সালে ৬৫ বিঘা জমি উঁচু জমি হিসেবে স্থানীয়দের কবুলিয়ত লিজ দেওয়ার পর জলাভূমির পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৮ বিঘায়। জলাভূমির এই সংকোচনের ফলে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
নীলফামারীর জেলা প্রশাসক নায়িরুজ্জামান বলেন, “প্রাথমিকভাবে এটাকে আসলে এক প্রকার কয়লা বিবেচনা করা যেতে পারে। এই মাটির গুণাগুণ নিয়ে খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবে জেলা প্রশাসন।”