সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জার্নাল থেকে বাংলাদেশের বেশ কিছু গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের (রিট্র্যাকশন) খবর জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। গবেষণা-নৈতিকতা, মান এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই আলোচনা তথ্যভিত্তিক না হয়ে ঢালাও অভিযোগের রূপ নিচ্ছে, যা প্রকৃত গবেষকদের নিরুৎসাহিত করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন আলোচনায় এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্ভবত কোনো গবেষণাই হচ্ছে না। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। যদিও এই সমালোচনার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে, তবে এর ফলে প্রকৃত সত্য অনেক সময় আড়াল হয়ে যাচ্ছে বা ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, গবেষণা-অসদাচরণের ক্ষেত্রে কোনো আপসের সুযোগ নেই। "প্ল্যাজারিজম, তথ্য জালিয়াতি, ডেটা তৈরি করে দেওয়া, ভুয়া পিয়ার রিভিউ, সাইটেশন ম্যানিপুলেশন কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের প্রতারণা গবেষণার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।" যেখানে এসব ঘটেছে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে মনে রাখা জরুরি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা নীতিমালা অনুযায়ী গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের মানেই সবসময় প্রতারণা নয়। অনিচ্ছাকৃত পরীক্ষাগত ভুল, পরিসংখ্যানগত ত্রুটি, সফটওয়্যারজনিত সমস্যা, নমুনা ব্যবস্থাপনায় ভুল বা নৈতিক অনুমোদনের জটিলতার কারণেও রিট্র্যাকশন হতে পারে। অনেক সময় গবেষকরা নিজেরাই ভুল শনাক্ত করে প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তাই প্রতিটি ঘটনাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে কিছু গভীর কাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান। শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতির প্রভাব এখানে স্পষ্ট। এছাড়া পদোন্নতির জন্য দ্রুত গবেষণাপত্র প্রকাশের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘদিনের। তবে এই নেতিবাচক চিত্রটি মুদ্রার এক পিঠ মাত্র। যারা অনিয়ম বা প্রতারণায় জড়িত, তারা সংখ্যায় অত্যন্ত অল্প। তাদের অপরাধের দায় হাজারো সৎ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষকের ওপর চাপানো ন্যায়সংগত নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গবেষণা কেন প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না, সেই বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ জনপরিসরে খুব কমই হয়।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা বিশেষ করে প্রান্তিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে থাকেন। শিক্ষকসংকটের কারণে একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে অতিরিক্ত ক্লাস, গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা, শিক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধান এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যা আলাদা ব্যক্তিরা করেন, এখানে তা একজন শিক্ষককেই করতে হয়। ফলে গবেষণার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সময় পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থসংস্থানের সংগ্রাম আরও কঠিন। বিজ্ঞান গবেষণার জন্য আধুনিক গবেষণাগার ও নিয়মিত রিএজেন্ট-কনজ্যুমেবল প্রয়োজন, যার জন্য বিপুল অর্থের দরকার হয়। গবেষণা-অনুদান সীমিত এবং বরাদ্দের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে। অনেক শিক্ষক নিজস্ব প্রচেষ্টায় অনুদান জোগাড় করে ল্যাব স্থাপন করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া সরকারি প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া গবেষকদের গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক কাজেই বেশি ব্যস্ত রাখে। প্রকল্পের অর্থের বড় অংশ পূর্বনির্ধারিত খাতে ব্যয় হওয়ায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট কেনাই সম্ভব হয় না। অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে গবেষণা চালিয়ে যান।
এত প্রতিকূলতার মাঝেও প্রতিবছর বহু তরুণ গবেষক বিদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে আসছেন এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করছেন। এই ইতিবাচক দিকগুলো খুব কমই আলোচনায় আসে। কোনো দেশের গবেষণার মান শুধু মেধার ওপর নয়, বরং গবেষণা-পরিবেশ ও সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে। তাই এখন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্পষ্ট গবেষণা-নীতি ও নৈতিকতা নীতিমালা প্রণয়নের সময় এসেছে। সেখানে গবেষণা-অসদাচরণের সংজ্ঞা, স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া, অথরশিপ নীতিমালা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
পাশাপাশি গবেষণা-নৈতিকতার প্রশিক্ষণ, দক্ষ প্রশাসনিক জনবল এবং স্বচ্ছ মেধাভিত্তিক অনুদান ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। গবেষকদের প্রশাসনিক কাজ থেকে মুক্ত করে গবেষণায় সময় দেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার করে শুধু প্রকাশনার সংখ্যার বদলে গবেষণার মান, মৌলিকতা, সামাজিক প্রভাব এবং গবেষণাগার গড়ে তোলার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, "শুধু প্রকাশনার সংখ্যা দিয়ে একজন শিক্ষকের গবেষণা মূল্যায়ন করলে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মূল্যায়নে গবেষণার মান, মৌলিকতা, সামাজিক প্রভাব, গবেষণা-নৈতিকতা, শিক্ষার্থী তৈরি ও গবেষণাগার গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।"
গবেষণাপত্র প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা ও অনিয়মের বিচার হওয়া প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি সত্যিই গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি? আমাদের এমন সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার যেখানে গবেষণা-অসদাচরণের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা থাকবে এবং সৎ গবেষকদের জন্য থাকবে যথাযথ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। সততা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রকৃত গবেষণা-সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।
— ড. অভিনু কিবরিয়া ইসলাম, সহযোগী অধ্যাপক, অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।