শুধু প্রাণ ও প্রকৃতির স্বার্থেই নয়, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ গড়তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করে তুলতে হবে। পরিচ্ছন্নতা ও বৃক্ষরোপণের দায়িত্ব কেবল মালি বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর নয়; ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ প্রত্যেকেরই এ ব্যাপারে সচেতন ও সক্রিয় থাকা দরকার। ভালো ফল পেতে বড় কোনো প্রকল্প বা বিপুল অর্থায়নও অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন পরিকল্পনা, কৌশল এবং ব্যবস্থাপনার সমন্বয়—যাতে উদ্যোগটি টেকসই ও স্থায়ী হয়।
শিক্ষার সঙ্গে প্রকৃতি ও পরিবেশের সম্পর্ক গভীর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বিশ্বভারতী’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রকৃতিঘনিষ্ঠ শিক্ষার ভাবনা থেকেই। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও শিক্ষার পরিবেশকে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সমন্বিত করার চেষ্টা করছে। পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ক্যাম্পাস তরুণ শিক্ষার্থীদের মনকে প্রশান্ত রাখে, আবার জ্ঞান আহরণের প্রতি আগ্রহও বাড়ায়।
উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে উঠলে শিক্ষকেরাও মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে এনে পাঠদান করতে পারেন। শিক্ষার্থীরাও গাছের ছায়া বা সবুজ প্রান্তরে বসে দলগত আলোচনা, বিতর্ক কিংবা গানসহ নানা ধরনের গঠনমূলক কাজে অংশ নিতে পারে।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পরিচ্ছন্নতার জন্য অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয় নিয়োগপ্রাপ্ত ও খণ্ডকালীন কর্মচারী বা কর্মীর ওপর। তাছাড়া প্রয়োজনীয় স্থানে ময়লা ফেলার বিন বা পাত্র পর্যাপ্ত থাকে না বলেও দেখা যায়। ফলে কাগজ, টিস্যু কিংবা অন্যান্য বর্জ্য প্রায়ই দেখা যায় যেখানে–সেখানে ফেলে রাখা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট সীমানাপ্রাচীর নেই বলে এর ভেতর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ ও ভ্রাম্যমাণ হকারের কারণে ক্যাম্পাসের পরিবেশও সহজে নষ্ট হয়। আবার অনেকেই জানেন না, থুতু-কফও সব জায়গায় ফেলা যায় না—এমন আচরণও সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।
বৃক্ষরোপণেও কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত নজরদারি ও পরিকল্পনার ঘাটতি আছে। এ কারণে দেখা যায়—নতুন ভবন বা স্থাপনা নির্মাণের সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিণত ও বড় গাছ কেটে ফেলতে হয়। অনেকেই হয়তো লক্ষ করেছেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুরসংখ্যক গাছ কেটে প্রয়োজনের অতিরিক্ত টং ঘর ও খাবারের দোকান তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া বা অজ্ঞাতে এগুলো বসানো হয়েছে—এমনটি নিশ্চয় বলা যায় না। একই সঙ্গে, বিপরীত চিত্রও আছে; কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যাপকভাবে গাছ লাগাতেও দেখা যায়।
এ প্রেক্ষাপটে পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নের উদ্যোগ পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে নেওয়া উচিত। প্রথম ধাপে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ কাজের জন্য একটি কমিটি তৈরি করতে পারে। কমিটিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাজ করবেন। একই কমিটিই প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব দেবে—কীভাবে ক্যাম্পাসকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করে তোলা যায়।
এরপর অন্যদের মতামত এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে। বাস্তবায়নের পর্যায়ে প্রতিটি বিভাগ থেকে অন্তত একজন শিক্ষক এবং চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী যুক্ত থাকা দরকার। পুরো উদ্যোগ সফল হলে দু-চার বছর পর হয়তো সরাসরি অংশগ্রহণের প্রয়োজন কমে আসতে পারে।
ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা, গাছের যত্ন এসব কাজে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মালির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের পদে প্রয়োজনীয় লোকের অভাব আছে। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী থাকলেও তাঁদের ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না। প্রয়োজনে নতুন পদ তৈরি করতে হবে; আর সেটি সম্ভব না হলে খণ্ডকালীন লোক নিয়োগ দিতে হবে।
পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়ন—দুই ক্ষেত্রেই উদ্যোগগুলো নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে চালাতে হবে। শুধু জায়গায় জায়গায় ডাস্টবিন বসানো কিংবা গাছ লাগিয়েই সমস্যার সমাধান হবে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। পরিচ্ছন্নতার কাজকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে—প্রত্যেককে দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি সবার কাছে এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে।
সবুজায়নের ক্ষেত্রে শুধু গাছ লাগানোই যথেষ্ট নয়; সেগুলোর বৃদ্ধি ও বিকাশের প্রতিটি পর্যায়ে যত্ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে মিল রেখে প্রশাসনের উদ্যোগ এবং নজরদারির আওতায় গাছ লাগানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে যে কোনো জায়গায় গাছ লাগানো যাবে না—এমনটি না করলে যে কোনো সময় সেগুলো কেটে ফেলতে হতে পারে।
ময়লা ফেলার পাত্র স্থাপন নিয়েও ভাবনা প্রয়োজন। সাধারণত এমন আকৃতির পাত্র রাখা হয় বা এমন জায়গায় রাখা হয়, যার দরুন সৌন্দর্যেরও হানি হয়। এ ক্ষেত্রে চাহিদামতো বিশেষ আকারের পাত্র তৈরি করে নেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আবর্জনার ধরন অনুযায়ী সেগুলো আলাদা আলাদা পাত্রে ফেলার বিষয়টিও অনুসরণ করা দরকার।
তাই ক্যাম্পাসে ময়লা ফেলার বিনগুলো কয়েক রঙের বা ধরনের হওয়া উচিত। কোথায় কোথায় সেগুলো স্থাপন হবে—সেটিও হবে সামগ্রিক পরিকল্পনার অংশ। যেখানে–সেখানে ময়লা ফেলার প্রবণতা রোধ করতে নির্দেশাবলি যুক্ত করে কিছু বিজ্ঞপ্তি বা নোটিশ লাগানো যেতে পারে। শুরুতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৈরি করা স্বেচ্ছাসেবকদেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ দরকার হবে।
ক্যাম্পাসে গাছ বা চারা লাগানোর সময় পেশাদার ব্যক্তিদের সহায়তা নেওয়া জরুরি। কোথায় কোনো গাছ লাগালে সৌন্দর্য বাড়বে—এ বিষয়টি বিবেচনায় যেমন রাখতে হবে, তেমনি গাছ ও চারা নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের মাটি ও আবহাওয়ার দিকেও নজর দিতে হবে। এখনকার অনেক শিক্ষার্থী গাছের নাম ঠিকমতো জানে না; তাই গাছের নাম ও পরিচিতি তুলে ধরার প্রয়োজনও আছে। ক্যাম্পাসকে যত বেশি সবুজ করা যাবে, ততই পাখি ও অন্যান্য প্রাণের জন্যও তা সহায়ক হবে।
ক্যাম্পাসের পরিচ্ছন্নতা ও গাছের যত্ন নিশ্চিত করতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও মালির উপস্থিতি প্রয়োজন—এ কথাও আবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের পদে প্রয়োজনীয় লোকের অভাব আছে। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারী থাকলেও তাঁদের ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না। প্রয়োজনে নতুন পদ তৈরি করতে হবে; আর সেটি সম্ভব না হলে খণ্ডকালীন লোক নিয়োগ দিতে হবে।
পরিচ্ছন্নতা ও সবুজ করার পাশাপাশি ক্যাম্পাসকে শব্দদূষণমুক্ত রাখার বিষয়টিও ভাবতে হবে। কোনো কোনো ব্যাচের বিদায় অনুষ্ঠান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আয়োজন যেভাবে বাদ্য বাজিয়ে ও শব্দ করে উদ্যাপন করা হয়, তা নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষারও ব্যাঘাত ঘটায়। সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষাগ্রহণের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে অভ্যাগতদের কাছে সুভ্যেনির হিসেবে বিক্রির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছপালা ও পাখির বর্ণনা ও ছবি-সংবলিত পুস্তিকা তৈরি করাও একটি চিন্তাযোগ্য উদ্যোগ হতে পারে।
• তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।