সান্তোসের প্র্যাকটিস মাঠে দুপুরের রোদ এসে পড়ে ঘাসে। দলের অনুশীলন চললেও এই চেনা প্রাঙ্গণে নেইমারের অনুপস্থিতি চোখে পড়ে। তিনি তখন ছিলেন ট্রেনিং সেন্টারের মূল ভবনে। গাড়ি এসে থামলে তিনি নামেন, কয়েক মিনিট অবস্থান করেন এবং পরে কারও অনুমতির ধার ধারে না দেখিয়ে বেরিয়ে যান। রিকভারি সেশনটি তখনও অনাগত প্রশ্নের মতোই পড়ে থাকে।
ঘটনাটি গত মাসের শেষ দিকে—শাপেকোয়েনসের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্রয়ের পরদিন। সান্তোস-চত্বরে এরপর থেকে এমন দৃশ্যই যেন তুলনামূলকভাবে নিয়মিত হয়ে উঠেছে। নেইমার নিজস্ব ছন্দে থাকেন; মাঠে নামেন, গোলও করেন, আবার মাঝেমাঝে বিতর্কেরও জন্ম দেন। তবে অনেক কিছুর ভেতর একটা ভাব দেখা যায়—তিনি যেন দলের সঙ্গে থাকলেও পুরোপুরি সেখানে নেই।
এই পরিস্থিতি কি কোনো অভিমান থেকে, নাকি দূরের কোনো মহাদেশের ডাক কানে কানে পৌঁছে দেওয়ায় মন হয়ে উঠছে অস্থির?
৩৪ বছর বয়স ফুটবলারের ক্যারিয়ারের শেষ অপরাহ্নে পৌঁছানোর ইঙ্গিত কি করে—তা নিয়েই এখন জোর কৌতূহল। সান্তোসের সঙ্গে চুক্তির শেষ পাতায় মেয়াদের তারিখ লেখা আছে ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৬। তবে সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই ব্রাজিলের ফুটবলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রাজিলিয়ান জাদুকর কি সান্তোসেই থাকবেন, নতুন কোনো ঠিকানায় ডানা মেলবেন, নাকি হঠাৎ করে বুটজোড়া তুলে রেখে ফুটবলকে বিদায় বলবেন—এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই জলছাপের মতো ভেসে উঠছে এক নাম: ইন্টার মায়ামি।
ফ্লোরিডার মিঠে রোদ আর আটলান্টিকের হাওয়া ইতিমধ্যেই এক মায়াবী অতীতকে ঘিরে রেখেছে। সেখানে মেসির বাঁ পায়ের জাদু আর সুয়ারেজের শিকারি চোখ প্রতিদিনই নতুন গল্প যোগ করতে থাকে। এখন যদি সেই গল্পের সঙ্গে যোগ হয় নেইমারের পরিচিত ছটফটে শৈল্পিক স্পর্শ—তবে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ কি আর থেমে থাকার মতো থাকে?
এমএসএন—তিন অক্ষরের একটি শব্দবন্ধ, যা একসময় গোটা ইউরোপের রক্ষণভাগকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেয়ার মতো ঘটনাও তৈরি করেছিল। বার্সেলোনায় ২০১৪ থেকে ২০১৭—এই তিন বছরে ফুটবল বিধাতা হয়তো তাঁদের এক ক্যানভাসে এনেছিলেন সৌন্দর্য আর ধ্বংসাত্মক শক্তির এক অসামান্য মেলবন্ধন দেখাতে। তিন মৌসুমে ৯টি ট্রফি, যার মধ্যে ইউরোপ সেরা চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে ট্রিপল মুকুটের অমলিন গৌরব। প্রথম মৌসুমেই তিনজনে মিলে করেছিলেন ১২২টি গোল—মেসির ৫৮, নেইমারের ৩৯, সুয়ারেজের ২৫। লুইস এনরিকের সেই বার্সেলোনাকে খেলাধুলার ইতিহাস ধরে রেখেছে এক মন্ত্রমুগ্ধ সুরের মতো।
রোনালদো-মেসি-নেইমার—তিনজনের সঙ্গেই খেলেছেন যাঁরা .
তবে সময় নদীর গতিপথ বড় অদ্ভুত। ইন্টার মায়ামিতে মেসির পাশে গত ডিসেম্বরেই শেষবারের মতো খেলে বিদায় নিয়েছেন সেই সময়ের আরও দুই সারথি—সের্হিও বুসকেতস ও জর্দি আলবা। এমএলএস কাপ জেতার পর তাঁদের বিদায় যেন বার্সেলোনার সেই সোনালি প্রজন্মের আরেকটি অধ্যায়ের ইতি টেনেছিল। ডেভিড বেকহামের মায়ামির প্রজেক্টে এখন দরকার নতুন প্রাণ। আর ঠিক এই জায়গাতেই এসে দাঁড়ান নেইমার।
এই ভাবনা আসলে কেবল নস্টালজিয়া ফিরিয়ে আনার গল্প নয়; পাশাপাশি বাণিজ্যিক দিকও এতে আছে। কিন্তু এই রোমাঞ্চের আড়ালে বাস্তবতার কঠোর হিসাবটাও কি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব? বয়স ৩৪ ছুঁয়েছে নেইমারের, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোট যেন সবসময় ছায়ার মতো পিছু লেগে আছে তাঁর। জাদুকরি পায়ে হয়তো পুরোনো সেই আলো আবার জ্বলে উঠতে পারে, কিন্তু শরীর কি পারবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ একটানা সেই লড়াইয়ের তীব্রতা ধরে রাখতে? তিনি কি আবার কোনো দলের ভাগ্য বদলে দেওয়ার নায়ক হতে পারবেন—এ প্রশ্নই আপাতত বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সান্তোস অপেক্ষা করছে নেইমারের সিদ্ধান্ত জানার জন্য। ইন্টার মায়ামি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব না পাঠালেও প্রিয় বন্ধু মেসির সেখানে উপস্থিতি নেইমারের জন্য এক ধরনের অদৃশ্য আকর্ষণ তৈরি করে রাখছে। দিন শেষে সিদ্ধান্তটা নেইমারেরই। ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় তিনি নিজের জন্য কোন পথ বেছে নেবেন—তা তাঁরই কলমে লেখা হবে। যে ত্রয়ী একসময় কাম্প ন্যু-র ঘাসে ফুটবলকে কবিতায় রূপ দিয়েছিল, সেই কবিতা কি আরও একবার পড়া যাবে মায়ামির সৈকতে?
নেইমারকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার প্রস্তাব নিয়ে যা হলো