খুলনা ও সিরাজগঞ্জে বন্ধ থাকা তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ইজারা নিতে যাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপ। দুই শিল্পগোষ্ঠী এসব বন্ধ মিলগুলোতে তৈরি পোশাক, জুতা, খেলনা, আসবাব, বৈচিত্র্যময় পাটপণ্য এবং লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনে মোট ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এতে মোট ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

বিজেএমসির তথ্যানুযায়ী, খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ৩০ বছরের জন্য ইজারা পাচ্ছে হ্যামকো গ্রুপের আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড। অন্যদিকে খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস এবং সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলস ইজারা পাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মামনুর রশিদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, খুলনা ও দিনাজপুরের তিনটি পাটকল প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপকে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। কাল (আজ মঙ্গলবার) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে ইজারার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হবে বলে জানান তিনি।

এর আগে, বেসরকারি পাটকল লাভের মুখ দেখলেও বিজেএমসির অধীনে থাকা পাটকলগুলো বছরের পর বছর লোকসান গুনছিল। লোকসানের বোঝা বইতে না পেরে সরকার একপর্যায়ে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠিয়ে ২০২০ সালের ১ জুলাই ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেয়। এর মধ্যে ২২টি পাটকল ও ৩টি নন–জুট কারখানা।

পাটকল বন্ধ হওয়ার পর সেগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে তৎকালীন সরকার। এখন পর্যন্ত ১৪টি পাটকল বেসরকারি খাতে ইজারা দিয়েছে বিজেএমসি। এর মধ্যে ৯টি উৎপাদনে গেছে। এতে সাড়ে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে বিজেএমসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রাণ-আরএফএল

খুলনার স্টার জুট মিলস ও সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিল ইজারা নিয়ে সেখানে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দুটি কারখানায় সাড়ে ১১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

জানা গেছে, ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত স্টার জুট মিলসের ৫৬ একর জমির মধ্যে প্রায় ৪৬ একর ইজারা পাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে উচ্চমূল্যের পাটজাত পণ্য, আসবাব, মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার (এমডিএফ) বোর্ডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনে প্রায় ২৫০ কোটি বিনিয়োগ করা হবে। এতে ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কারখানাটি থেকে বার্ষিক ৫০০ কোটি টাকা পণ্য বিক্রির পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে শিল্পগোষ্ঠীটি।

এদিকে ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসের ৭৫ একরের মধ্যে প্রায় ৩৮ একর জমি ইজারা পাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, ব্যাগ, জুতা ও খেলনা উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের পাশাপাশি কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও পণ্য সংরক্ষণাগার নির্মাণে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। এতে সাড়ে ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কারখানাটির বার্ষিক টার্নওভার বা লেনদেন হবে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।

হ্যামকো গ্রুপ করবে দুটি কারখানা

হ্যামকো গ্রুপ খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল ইজারা পাচ্ছে। ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ওই মিলের প্রায় ৫৬ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫০ একর ইজারা নেওয়া হবে। সেখানে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে দুটি কারখানা স্থাপন করা হবে। এতে কর্মসংস্থান হবে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের।

হ্যামকো গ্রুপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলে তারা দুটি কারখানা করবে। তার মধ্যে একটি হবে পাটের বিশেষায়িত ম্যাট্রেস উৎপাদন কারখানা। এই ম্যাট্রেস বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হবে। চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে কারখানাটি করা হবে হ্যামকো। এ ছাড়া লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের একটি কারখানা স্থাপন করবে তারা। বিদেশ থেকে ব্যাটারির সেল আমদানি করে ব্যাটারি উৎপাদন হবে সেখানে।

১৯৮৬ সালে আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হ্যামকো গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়। ব্যাটারি খাতের স্বনামখ্যাত এই গ্রুপ পরে প্লাস্টিকের গৃহস্থালি পণ্য ও আসবাবপত্র, নন-স্টিক কোটেড অ্যালুমিনিয়াম ও স্টেইনলেস স্টিলের রান্নার সামগ্রী, চামড়া ও স্পোর্টস জুতা, টায়ার এবং গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য বৈদ্যুতিক পণ্যে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে।

উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কারখানা দুটিতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদন করা হবে। আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন শুরু করব।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জায়গা কিনে সেটি উন্নয়ন করে কারখানা নির্মাণ করতে সাধারণত তিন-পাঁচ বছর সময় লেগে যায়। তার বিপরীতে রেডি (প্রস্তুত) জমি পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে যাওয়া যায়। এতে সময়ের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অর্থও সাশ্রয় হয়।

এদিকে, জানাতে চাইলে হ্যামকো গ্রুপের কোম্পানি সচিব রেজাউল করিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বিজেএমসি আমাদের তিন মাসের মধ্যে বন্ধ পাটকলটি বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেছে। তারপর আমরা কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করব। আমাদের প্রত্যাশা, এক বছরের মধ্যে আমরা দুটি কারখানাই চালু করতে পারব।’

এর বাইরে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত রাজশাহী টেক্সটাইল মিল এবং রাজশাহী জুট মিলও সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে (পিপিপি) চালু করেছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। দুটি কারখানায় এখন পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষ কাজ করছেন। শিগগিরই এই সংখ্যা আরও বাড়বে।