চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে অবস্থিত ‘স্বাধীনতা কমপ্লেক্স’ কেবল একটি সাধারণ শিশুপার্ক বা বিনোদনকেন্দ্র ছিল না; ১৬ একর আয়তনের এই প্রাঙ্গণ ছিল সমগ্র বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য মেলবন্ধন। জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ ভবন, আহসান মনজিল, কার্জন হল এবং কান্তজিউ মন্দিরের মতো দেশের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর আদলে গড়ে তোলা এই ‘মিনি বাংলাদেশ’ একসময় দর্শনার্থী ও শিক্ষার্থীদের প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছিল। তবে দীর্ঘ দুই বছর ধরে বন্ধ থাকার ফলে বর্তমানে এই পুরো এলাকাটি আক্ষরিক অর্থেই জঙ্গলে পরিণত হয়েছে, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্কটির এই করুণ অবস্থার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ইজারা-বাণিজ্যের অশুভ সংস্কৃতি। ২০০৬ সালে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত এই কমপ্লেক্সটিকে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় প্রভাবশালী ইজারাদাররা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় এই কমপ্লেক্সটি হামলার শিকার হয়। এরপর থেকে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় কোটি কোটি টাকার বিনোদন রাইডগুলোতে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া লোহার সামগ্রী ও কৃত্রিম রেলপথ চুরি হওয়ার পাশাপাশি পুরো চত্বরটি এখন সাপ, পোকামাকড় এবং অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও গত দুই বছরে এটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিনোদনকেন্দ্রটি পুনর্গঠন ও সচল করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্বশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পার্কটিকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে নগরবাসীর জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আগ্রহ দেখালেও, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় পুনরায় ব্যক্তিগত ইজারাদার খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অতীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যক্তি খাতের কাছে ইজারা দেওয়ার ফলে প্রবেশমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল, যা নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
আমাদের মনে হয়, অবহেলার এই ‘জঙ্গল’ থেকে ‘মিনি বাংলাদেশ’কে অবিলম্বে উদ্ধার করা প্রয়োজন। পার্কটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ব্যক্তিগত লাভজনক গোষ্ঠীর সুযোগ করে দেওয়ার পুরোনো প্রথা ভেঙে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালনার পরিকল্পনা বিবেচনা করা যেতে পারে। কোটি টাকার জাতীয় সম্পদকে এভাবে নষ্ট হতে না দিয়ে ‘মিনি বাংলাদেশ’কে দ্রুত তার পূর্বের গৌরবে ফিরিয়ে আনাই হবে সঠিক ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।