নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার গতকাল ৮৫ বছর পূর্ণ করেছেন। ঢাকার বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিক কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা রামেন্দু কাকার পারিবারিক ঘরোয়া স্বভাবের কথা তুলে ধরেন।

.

“রামেন্দু কাকা আমার খালু হন। কিন্তু ডাকি কাকা। কেন?
আমার খালার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৯৭০ সালে। কিন্তু তিনি তার আগে থেকেই আমার নানুবাসা সেন্ট্রাল রোডের দারুল আফিয়ায় আসতেন। তখন তো আর আমরা তাঁকে খালু ডাকতে পারতাম না, তাই তিনি আজীবন কাকা।”

বক্তা বলেন, পরিবারের অন্য দিক থেকেও “কাকা” নামে আরও কয়েকজন আপন ছিলেন। হাতিরপুল পুকুরপাড়ের বাসাতেও তাঁদের সবার অবাধ যাতায়াত ছিল। তিনি জানান, ’৬৯-৭০ সালের দিকে নানুবাসার দোতলায় ছোট ছাদে কাজিনদের সঙ্গে প্রেম বিষয়ে কথাবার্তা চলত—তৎকালীন নিজেদের বয়স অনুযায়ীই।

“কাজিনরা বলে থাকে, আমি নাকি দুই-তিনটা নজির তুলনা করতে করতে বলেছিলাম, ফেরদৌসী খালা আর রামেন্দু কাকার প্রেম এমন—‘ফেরদৌসী, দেখো, আজ কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে!’”

তিনি আরও স্মরণ করেন, ফেরদৌসী খালাকে তিনি অন্য নামে ডাকতেন—“পিচ্চি।” “আমার বয়সের কাজিনরা কেউ ডাকে পিচ্চি আম্মা, পিচ্চি খালা। আমি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় পিচ্চি আমাকে বাংলা আর ইসলামিয়াত পড়াতেন।”

তখন ইন্দিরা রোডে একতলা বাসায় তাঁরা থাকতেন বলে উল্লেখ করেন কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা। স্কুল ছুটির দিনে বাবা সকালে তাঁকে সেখানে পৌঁছে দিতেন। তার বর্ণনায়, সারাদিন পড়াশোনা, সুখাদ্য খাওয়া আর পেয়ারা পাড়ার মধ্যেই সময় কাটত। বাসায় অনেক পেয়ারাগাছ ছিল; কখনও কখনও “কালো কালো বিছা মারার অভিযান”ও হতো।

তিনি বলেন, বাবার অফিস থেকে ফেরার সময় তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে আসার কথাও মনে আছে। “কোনো দিন তাঁর সন্ধ্যা পেরিয়ে যেত। মনে আছে, সন্ধ্যায় খাবার টেবিলে রামেন্দু কাকা আর পিচ্চি নাটকের সংলাপ চর্চা করতেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। তখন বোধ হয় থিয়েটার দল মাত্র হয়েছে বা প্রস্তুতি চলছে।”

রামেন্দু কাকার সঙ্গে স্মৃতির বড় অংশ নীরবতায় ভরা বলে জানান বক্তা। তাঁর পর্যবেক্ষণ, “তিনি কথা কম বলেন। কিন্তু আমরা ছোটরা তাঁর স্নেহ টের পেতাম। নীরব একটা ভরসার মতো। ছোটদের তিনি পাত্তা দিতেন নীরবে।”

ঈদের কথাও উঠে আসে আলোচনায়। “সেদিন আমার কাজিন লালী মনে করিয়ে দিয়েছে ঈদ আর ঈদির কথা। ছোটবেলায় ঈদের দুপুরটা কাটত নানুবাসায়—সবাই একসঙ্গে। সেই আমলে আমাদের পরিবারে ঈদি দেওয়ার চল ছিল না। কিন্তু রামেন্দু কাকা এসেই আমাদের এক-দুই শ টাকা দিতেন। আমার ছোট খালু শওকত কাকাও দিতেন। আইসক্রিম খাওয়ার টাকা, তখন সেটা দারুণ একটা প্রাপ্তি।”

রামেন্দু কাকার স্নেহশীলতাও তিনি জোর দিয়ে বলেন। “যত্ন আর দেখভাল করার একটা ব্যাপার তাঁর মধ্যে আছে।” মা-খালাদের মুখে শোনা কথার উল্লেখ করে তিনি বলেন, “পিচ্চি টাকাপয়সার হিসাব রাখতে বিরক্ত হতো। রামেন্দু কাকা মাসের শুরুতে খাত ধরে খামে টাকা ভাগ করে দিতেন।”

বড় হওয়ার সময় ৩৫ তোপখানা রোডে বিটপী বিজ্ঞাপনী সংস্থার অফিসটিকে তিনি পরিবারের মতো করে দেখেছেন। বাবার আবদুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একতলার “ক্রিয়েটিভ” বিভাগে কর্মীদের আনাগোনার মধ্যে দোতলায় উঠলেই রামেন্দু কাকার ঘর ও মানুষের সরগরম পরিবেশ দেখা যেত বলে জানান তিনি।

বক্তা জানান, রামেন্দু কাকার রসবোধেরও টুকরো কিছু তিনি পেয়েছেন। “তাঁর রসবোধ একটা অন্য রকম মজা। একটা চুপচাপ, ইংরেজিতে যাকে বলে ড্রাই হিউমার। মন্তব্যগুলো ছোট কিন্তু মোক্ষম হয়, মোলায়েম মসৃণ একটা ধারও হয়তো থাকে।”

এমএ পরীক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এমএ পরীক্ষায় কীভাবে যেন আমি ভালো ফল করে ফেললাম। রামেন্দু কাকা খুব খুশি হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ বইটা নিয়ে বাসায় এলেন।” এরপর বইয়ের এক খণ্ডে লেখা আরেক খণ্ডে লেখা—দু’টি লাইনের হুবহু উদ্ধৃতি দেন তিনি।

“মিতি/কী আশ্চর্য!”
“কী দরকার ছিল এত ভালো ফল করার!”

তিনি আরও স্মরণ করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেওয়ার খবরে রামেন্দু কাকা খুব খুশি হয়েছিলেন। আর শিক্ষকতা ছেড়ে দিলে তিনি দুঃখ পেয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। “এই আনন্দ এবং দুঃখ অবশ্য ত্রপাও তাঁকে দিয়েছে!”

পরিবার প্রসঙ্গে কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা জানান, তাঁর খালাতো বোন লালী ও আয়েশা বানু শিক্ষকতার ধারা বজায় রেখেছেন। রামেন্দু কাকা তাদের স্নেহ আর গর্ব মিশিয়ে “প্রফেসর” বলে ডাকেন—এ অধ্যাপক হওয়ার আগ থেকেই।

তিনি বলেন, বাবা-মায়েদের ভাইবোন মিলিয়ে তাঁদের পরিবারে মোট ২৬ জন ছিলেন। মা দিলারা বেগমকে তিনি এই বড় পরিবারের প্রাণ হিসেবে দেখেছেন—রামেন্দু কাকার “দিলাপা।”

বক্তা জানান, রামেন্দু কাকারও তাঁর জন্য একটি নাম রয়েছে—“মিতি আপু।” বড় হয়ে ওঠার পরও রামেন্দু কাকা বাড়িতে এলে বিদায় নেওয়ার সময় সিঁড়িতে দুই হাত ঘুরিয়ে একটু নেচে নিতেন বলে স্মরণ করেন তিনি।

“বড় হতে হতে আমরা তো এখন বুড়ো হয়ে গেছি। অনেক দিন সেই নাচটা আর দেখি না। এবার যদি একবার দেখতে পাই! শুধু আমি, ত্রপা আর অন্য কোনো ভাইবোনদের সামনে—রামেন্দু কাকা, একবার দেখিও প্লিজ, কোনো একদিন, কোনো একটা সিঁড়িতে…
অনেক অনেক অনেক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা। তুমি অনেক ভালো থেকো।”

.

কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা, সাংবাদিক