ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এক বছরে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার যে খবর 'মুক্তকণ্ঠ'-এ প্রকাশিত হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন, ২০২৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরে গেছে। এই বিশাল সংখ্যাটি কেবল গাণিতিক হিসাব নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য শিশুর শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ার করুণ বাস্তবতা।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, দারিদ্র্যের প্রবল চাপে অনেক শিশু শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কেউ পরিবারের আয়ের সংস্থান করতে ঢাকায় গিয়ে কাজ শিখছে, আবার কেউ কেউ কওমি মাদ্রাসা বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা ও জীবিকার লড়াইয়ে জীবিকাই প্রাধান্য পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, প্রাথমিক শিক্ষা এখনো সবার জন্য সমানভাবে টেকসই হয়ে ওঠেনি।

ময়মনসিংহের এই চিত্রটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে ঝরে পড়ার হার পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং কিছু অঞ্চলে এই হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ধারণা করা যায়, দেশের অন্যান্য দরিদ্র জেলাগুলোতেও একই ধরনের প্রবণতা বিদ্যমান। এই ধারা অব্যাহত থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই শ্রেণিভিত্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যার ফলে দরিদ্র শিশুরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।

দারিদ্র্যের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ময়মনসিংহের প্রায় ৫৮ শতাংশ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষকসংকট এবং দুর্বল অবকাঠামো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একই কক্ষে একাধিক শ্রেণির পাঠদান চলছে অথবা নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমন পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থীদের কাছে বিদ্যালয়ের আকর্ষণ কমিয়ে দিচ্ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় এবং ঝরে পড়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। দরিদ্র পরিবারের জন্য শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা ও উপবৃত্তি কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে শিশুরা কাজে না গিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারে। পাশাপাশি 'মিড-ডে মিল' কর্মসূচি সর্বজনীন করা হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার বৃদ্ধি পেতে পারে। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিভাবকদের সাথে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ আরও জোরদার করতে হবে।

শিক্ষা কোনো সাধারণ খাত নয়, বরং এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি। একটি শিশু যখন বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে, তখন সে কেবল একটি শ্রেণিকক্ষ হারায় না, বরং হারায় একটি সম্ভাবনাময় জীবন। এক বছরে এক লাখের বেশি শিশুর এই হারিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।