প্রায় তিন যুগ পর ফের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের লড়াই হতে যাচ্ছে। সংখ্যার হিসাবে বিএনপির প্রার্থীই জিতবেন—এমন ধারণা বলয়ের বাইরে নেই। তবে ভোটে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আনা হয়েছে দলটিরই একসময়ের ঘরের লোককে। জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও মুক্তিযুদ্ধের বীরবিক্রম কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় ঐক্য। এই অসম প্রতিযোগিতার পেছনে জয়ের হিসাবের বাইরে আর কী ধরনের রাজনৈতিক লক্ষ্য আছে—এটাই এখন আলোচনায়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের ভোটে। বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ১১–দলীয় ঐক্যের সদস্য সংখ্যা ৭৮।

আজ রোববার মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১–দলীয় ঐক্যের বৈঠকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার ঘোষণা দেওয়া হয়। জামায়াত ছাড়াও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এলডিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এই জোটের অন্যতম সদস্য।

১১–দলীয় ঐক্যের সূত্র বলছে, জামায়াত অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিল। অলি আহমদও রাজি। এনসিপিসহ অন্য দলগুলো সেভাবে দ্বিমত করেনি।

সর্বশেষ ১৯৯১ সালে এই পদে ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস। এবার বিএনপির সংসদ সদস্য সংখ্যা ১৯৯১ সালের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে দলটির মনোনীত প্রার্থীই জয়ী হবেন—এ বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিরোধী দলগুলোর নেতাদের কাছেও এই হিসাব পরিষ্কার বলে আলোচনায় আছে। এরপরও অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে জোট এবং জোট–বহির্ভূত রাজনীতির নানা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন ১১–দলীয় ঐক্যের নেতারা।

জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে বারবার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে অলি আহমদ রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। যেকোনো সুযোগে অলি আহমদকে সামনে আনার চেষ্টা আছে বলে মনে করা হয় জামায়াতের পক্ষ থেকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের ১১–দলীয় ঐক্যে অলি আহমদকে ধরে রাখতে তৎপর ছিল জামায়াত। এতে একদিকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যুক্ত রাখা এবং একাত্তরের সমালোচনার বিষয়গুলোর প্রতিক্রিয়া দিতে সুবিধা হবে—এমন যুক্তি সামনে আসে।

জামায়াত ও এনসিপি সূত্র জানায়, ১১–দলীয় ঐক্য সরকার গঠন করতে পারলে অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি করতে হবে—এলডিপি থেকে এমন একধরনের চাওয়া ছিল। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার কথা চিন্তা করে জামায়াতও এ বিষয়ে তখন আশ্বাস দিয়েছিল। এখন রাষ্ট্রপতি পদে পরাজয়ের আশঙ্কা জেনেও জামায়াত তাদের পুরোনো প্রতিশ্রুতি পূরণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে সূত্রগুলো বলছে। এর মাধ্যমে সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ১১–দলীয় ঐক্য সক্রিয়—এটিও দেখাতে চেয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

জাতীয় নির্বাচনের আগে ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় নির্বাচনী সমাবেশ করে ১১–দলীয় ঐক্য। সেখানে অলি আহমদকে নিয়ে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে একাত্তর সালে স্বাধীনতার ঘোষণা এখান থেকেই (চট্টগ্রাম) হয়েছিল। আপনাদেরই এক গর্বিত সন্তান সবার আগে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, “উই রিভল্ট”। তিনি হচ্ছেন এলডিপির সম্মানিত সভাপতি কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম।’

জামায়াত আমিরের ওই বক্তব্যের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায় বিএনপি। পরদিন কক্সবাজারে এক নির্বাচনী পথসভায় বিএনপি নেতা (বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল এই দেশের, তারা এখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করা শুরু করেছে। গতকাল সেই দলের আমির বলেছেন, এই দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা নাকি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেয় নাই, তৎকালীন মেজর জিয়া দেয় নাই। কর্নেল অলি সাহেব নাকি দিয়েছেন। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃতি করবে—এটাই স্বাভাবিক।’

১১–দলীয় ঐক্যের একাধিক নেতার মতে, বিএনপি গত নির্বাচনের আগে একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি সামনে এনে জামায়াতকে বারবার চাপে ফেলার চেষ্টা করেছে। সে সময় অলি আহমদকে সামনে এনে চাপ সরাতে তৎপর ছিল জামায়াত। ভোটের পরও নানা বিষয়ে বিএনপি–বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে বিরোধী দলগুলোকে কাছে টানার চেষ্টা করেছেন অলি আহমদ বলেও বলা হয়।

সর্বশেষ গত ২৫ জুলাই সিলেটে এক সমাবেশে অলি আহমদ বলেছিলেন, ‘জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক—এই তিন নেতা যদি এক হয়ে যান, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে। এই সরকার পালানোর কোনো পথ পাবে না।’

আজকের বৈঠকে অংশ নেওয়া এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অলি আহমদ ছাড়া বৈঠকে অন্য নাম নিয়ে সেভাবে আলোচনা হয়নি। তাঁর নাম প্রস্তাব করা হলে অলি আহমদ সায় দেন। এরপরই ঘোষণা দেওয়া হয়।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তৎকালীন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা অলি আহমদ। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য এই সাবসেক্টর কমান্ডার পেয়েছিলেন বীরবিক্রম খেতাব। জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। সে বছর একটি উপনির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। ১৯৯১ সালে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৬ সালের দুটি সংসদ নির্বাচনেই বিএনপির সংসদ সদস্য হয়েছিলেন অলি আহমদ। এর মধ্যে প্রথম নির্বাচনে গঠিত বিএনপির সংক্ষিপ্ত সময়ের সরকারে (১১ দিন) তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য হলেও বিএনপির সরকারে জায়গা পাননি।

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির সাবেক মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০৪ সালে বিকল্পধারা নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এ সময় বিএনপির আরও বেশ কজন নেতা দল থেকে বেরিয়ে বি চৌধুরীর সঙ্গে যোগ দেন।

২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি ছাড়েন বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন সদস্য অলি আহমদ। তাঁর সঙ্গে বিএনপির আরও অনেক নেতা তখন দল ছাড়েন। গঠন করেন নতুন দল এলডিপি। বি চৌধুরী তাঁর দল বিকল্প ধারা বিলুপ্ত করে এলডিপিতে যোগ দেন। তবে তাঁদের এই যাত্রা বেশি দিন টেকেনি। বি চৌধুরী ও অলি আহমদ আলাদা হয়ে যান। বিকল্প ধারা আবার কার্যক্রম শুরু করে; আর অলির নেতৃত্বে এলডিপি কার্যক্রম চালিয়ে যায়।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এককভাবে এলডিপির ‘ছাতা’ প্রতীকে নির্বাচন করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে অলি আহমদ সংসদ সদস্য হন। পরে ২০১২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে ২০–দলীয় জোট গঠিত হলে সেখানে যোগ দেন কর্নেল অলি।

২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনেও ‘ছাতা’ প্রতীকে নির্বাচন করেন অলি আহমদ। তবে তাঁর আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। ২০২২ সালের শেষ দিকে ২০–দলীয় জোট ভেঙে দেয় বিএনপি। এরপর বিএনপির সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনেরও সঙ্গী ছিল অলি আহমদের এলডিপি।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির কাছ থেকে ১৪টি আসন চেয়েছিলেন এলডিপি। কিন্তু বিএনপি সেভাবে সাড়া দেয়নি। নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস আগে ২৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন অলি আহমদ। ২৮ ডিসেম্বর জামায়াত জোট থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন অলি আহমদ।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আছে যে ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন করা নিয়ে খুশি ছিলেন না মুক্তিযোদ্ধা অলি আহমদ। দলীয় ফোরামে সেটি প্রকাশও করেছিলেন। ২০০১ সালে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী ৪–দলীয় জোটের সরকারে অলি আহমদ স্থান পাননি। মন্ত্রিসভায় জায়গা পান জামায়াতের তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতা। ওই সময় অলি আহমদের সমর্থকেরা মনে করতেন, জামায়াতের বিরোধিতার কারণেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে স্থান পাননি অলি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দল ছাড়ার পর বিএনপির সঙ্গে অলি আহমদের সম্পর্কটা এগিয়েছে কখনো মিত্র, কখনো দূরে—অনেকটা এমন ধারায়। গত নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে যোগ দিয়ে অলি আহমদ প্রমাণ করলেন রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই। রাষ্ট্রপতি পদে অলি আহমদকে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে আরও নতুন মাত্রা যোগ করল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটটি।