ঢালিউডের জনপ্রিয় নায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ হত্যা মামলার অন্যতম প্রধান আসামি ও খল অভিনেতা মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আইনানুগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে।
দীর্ঘ তিন দশক ধরে চলমান এই মামলায় ডনের গ্রেপ্তারের খবর জানতে পেরে আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। তিনি বলেন, "সালমান আমার সন্তান, সে আমার বুকের মধ্যে আছে এবং থাকবে। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল ডন। শুধু তা-ই নয়, সালমানের মৃত্যুর পর সে আমাকে নানাভাবে অপমান করেছে এবং আমার ছেলের নামে বহু মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। আজ সে গ্রেপ্তার হয়েছে, সব সত্য ও প্রমাণ এক দিন আলোর মুখ দেখবেই।"
বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নীলা চৌধুরী আরও বলেন, "সালমান হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি আসামিকে যেন গ্রেপ্তার করা হয়। আমি আজও আশা রাখি, আমার সন্তান হত্যার সঠিক বিচার এক দিন পাব।"
তিন দশকের আইনি লড়াই
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় রহস্যজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সালমান শাহর মরদেহ। ওই সময় তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ঘটনাটিকে ‘হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গণ্য করার আবেদন জানান। আদালতের নির্দেশে সিআইডি সমন্বিত তদন্ত শুরু করলেও ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে, যা তৎকালীন সিএমএম আদালত গ্রহণ করেন।
সিআইডির এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে সালমানের পরিবার রিভিশন মামলা দায়ের করে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশের পরদিন ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম রমনা থানায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক ও খলনায়ক ডনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার অন্যান্য আসামি ও এজাহারের বিবরণ
মামলার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর মরদেহ পাওয়া যায়। সে সময় কয়েকজন নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে আসামি রুবি উপস্থিত ছিলেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে সালমানের গলায় রশির দাগ এবং মুখ ও পায়ে নীলচে চিহ্ন দেখা গিয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তদন্তের অংশ হিসেবে চলতি বছরের ২০ মে সালমানের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয় এবং ২৪ মে আদালত ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন। ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম তদারকির জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রায় ৩০ বছর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দিকে এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে মূল আসামি ডনের গ্রেপ্তারকে সিআইডি ও বাদীপক্ষের জন্য বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী ৩০ আগস্ট আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেছেন।