জুলাই গণ–অভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি করেনি; এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে, এক ধরনের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি জানান দিয়েছে এবং মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান কাঠামো দিয়েছে। ফলে পরিবর্তন বাস্তবায়নের তাগিদও তীব্র হয়েছে। লিখেছেন আলী রীয়াজ
.জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে প্রায় এক মাসজুড়ে যে আলোচনা-আলোচনাও বিতর্ক চলছে এবং এখনো অব্যাহত আছে, সেখানে অনেক বিষয়ই উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের মরণপণ লড়াইয়ের স্মৃতি আলোচিত হয়েছে, কার কী ভূমিকা ছিল—তা নিয়েও কথা হয়েছে। একইভাবে শহীদের আত্মদানের প্রসঙ্গ, তাঁদের প্রিয়জনদের আশা-আকাঙ্ক্ষা-হতাশার কথাও এসেছে বারবার। এসবের পাশাপাশি কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, জুলাই কি ব্যর্থ হয়ে গেছে। যতটা প্রত্যাশিত ছিল, তার তুলনায় কতটা অর্জিত হয়েছে—এই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই গণ–অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে মূল্যায়নধর্মী আলোচনা হবে—এটা বিস্ময়ের কিছু নয়। বরং সাম্প্রতিক দিনগুলোর আলোচনায় এই বিষয়টি তুলনামূলকভাবে বেশি জায়গা পেয়েছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে, যা ইতিবাচক। হতাশার সুরও শোনা গেছে, আবার জুলাইয়ের তাৎপর্য ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়েও গুরুত্ব দিয়ে কথা হয়েছে।
গণ–অভ্যুত্থান কত দ্রুত ফলাফল দিতে পারে—এই প্রশ্নে যাওয়ার আগে জুলাই অভ্যুত্থানের যে সাফল্য দৃশ্যমান, তা স্মরণ করা দরকার। ‘জুলাই অভ্যুত্থান দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছে। জনগণ তাদের হারানো ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছে। স্বৈরশাসনের সময় গুম, খুন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেভাবে সংকুচিত হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটিয়েছে এবং সেগুলো দূর করার একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে’ (এ কে এম জাকারিয়া, ‘একটি গণ-অভ্যুত্থান কত দ্রুত ফলাফল দিতে পারে’, মুক্তকণ্ঠ, ৫ আগস্ট ২০২৬)।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কারণে শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। এই তালিকায় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরুর কথাও যোগ করা যায়। এসব উদ্যোগের তাৎপর্যকে তাই গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
অন্যদিকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পথ ধরে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতাও মূল্যায়নের বিষয়। কার্যত ভেঙে পড়া একটি অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী পতনকে কিছুটা হলেও থামিয়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার চেষ্টা, সীমিত পরিসরে হলেও ব্যাংকিং খাত থেকে শুরু করে জনপ্রশাসন ও বিচার বিভাগ পর্যন্ত শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়াস—এসব বিষয় অন্তর্বর্তী সময়ের কৃতিত্বের তালিকায় পড়বে।
.বাংলাদেশে এ রকম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছিল ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময়ও। গণ–অভ্যুত্থানের পর তা একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত না হলেও, জনচেতনায় সেই পলিটিক্যাল কমিউনিটি বা রাজনৈতিক সম্প্রদায় সব ধরনের ভেদাভেদকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয় বলেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনায় নেতৃত্বের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেই কারণেই জনযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল।.
এই প্রচেষ্টার একটি বাস্তব প্রমাণ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে ধরা যায়। এর মধ্যে কিছু পদক্ষেপ ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এর অনেকগুলো সংসদে অনুমোদিত হয়েছে, আবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাতিলও হয়ে গেছে। দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনার নানা কঠিন চ্যালেঞ্জ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যে ফাটল, দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখার চেষ্টা, প্রশাসনের ভেতর থেকেই সংস্কারকাজে বাধা, রাস্তায় নেমে আসা নিত্যনতুন দাবির চাপ এবং ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারের দোসরদের অব্যাহত ষড়যন্ত্র—সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে প্রতিবন্ধকতা ছিল নানা ধরনের।
তবে সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং অশুভ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পশ্চাৎপদ চিন্তাচেতনার বিভিন্ন গোষ্ঠীর উত্থানের বিপরীতে সরকারের জোরালো পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল। গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী সামাজিক পরিবর্তনের একটি নেতিবাচক স্মারক হিসেবেই মব কালচার বা ‘উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংস্কৃতির’ উত্থান চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
.এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উদ্বেগজনক: নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি কম এবং অভ্যুত্থানে তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের ওপর হামলা ঠেকাতে সরকারের ব্যর্থতা, তুলনামূলকভাবে স্বাধীন গণমাধ্যম পরিবেশ বজায় রাখতে এসব সংবাদপত্রের ভূমিকার কৃতিত্বকেও ম্লান করে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিষ্ঠা যেহেতু অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই, তাই স্বাভাবিকভাবেই ওই সরকারের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতাকে গণ–অভ্যুত্থানের সাফল্য ও তার ভবিষ্যৎ প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করে বিচার করা হয়। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল এই মানদণ্ডে পরিমাপ করলে এর প্রকৃত রূপ, চরিত্র, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যৎ উপলব্ধি করা যাবে না।
এই মানদণ্ড অনুসরণ করেই কেউ কেউ এমন উপসংহারে পৌঁছাচ্ছেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেক প্রত্যাশার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে সেই আকাঙ্ক্ষাগুলো ক্রমেই অবসিত হবে এবং একধরনের হতাশা তৈরি হচ্ছে—এ কথাও বলা হচ্ছে।
.গণ–অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা—চিরাচরিত হলেও সেটি স্মরণ রাখতে হয়। জনগণই সর্বেসর্বা। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা যদি জনগণের এই শক্তিকে অবমূল্যায়ন করার দুঃসাহস দেখায়, তবে তার নিজের এবং দেশের জন্য বিপদ অনিবার্য হয়ে ওঠে। জনগণের সম্মিলিত পদক্ষেপ, ঐকতান এবং যৌথ প্রতিরোধ যেকোনো শক্তিশালী ব্যবস্থা ও স্বৈরশাসককে পরাস্ত করার ক্ষমতা রাখে। ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার চেয়ে জনগণের সম্মিলিত ক্ষমতা অনেক বেশি শক্তিশালী। যাঁরাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন বা হবেন—তাদের জন্য এটি শিক্ষণীয়।
এই অভ্যুত্থানের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছিল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজন বা বাম-ডান এবং ধর্মনিরপেক্ষ-ইসলামপন্থীদের বিদ্যমান মেরুকরণকেই কেবল অতিক্রম করেনি; বরং সমাজের চিরায়ত বিভেদও ভেঙে ফেলেছিল। স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি ‘সামষ্টিক রাজনৈতিক’ সত্তার উন্মেষ যখন ঘটছিল, তখন শ্রেণি, লিঙ্গ এবং জাতিগত পরিচয়ের বিভাজনগুলো কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল।
.হাসিনার প্রত্যর্পণের রাজনীতি ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক.শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়ার দিকগুলো কী কী.
এই জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষাগুলো ভাষা পেয়েছে ভিন্ন এক মাধ্যমে—গ্রাফিতি, স্লোগান এবং গানে গানে। অভ্যুত্থানের শহীদদের এক বিপুলসংখ্যক যে রিকশাচালক, পোশাকশ্রমিক, দিনমজুর, হকারসহ খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ—তাঁরাই এর প্রমাণ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাজন যেমন দেখা যায়নি, তেমনি এই প্রথম কোনো আন্দোলনে মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল। ৮৫ জন মাদ্রাসাছাত্র ও আলেমের শাহাদাতবরণ তার প্রমাণ দেয়। এসব ইঙ্গিত দেয়—একটি নতুন রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী বা পলিটিক্যাল কমিউনিটি গঠনের দিকে।
এই রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে; কোনো দল বা প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির সংগঠিত চেষ্টায় নয়। প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে—তাদেরকে অস্বীকার করে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া যাবে না। স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, পৃথিবীর অন্যত্র যেমন—তেমনি এই ক্ষেত্রেও আন্দোলনের শক্তি তৈরি করেছে, কিন্তু নেতৃত্ব তৈরি করেনি; কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়নি।
.যেকোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানেই নানা ধরনের প্রত্যাশার মোহনা তৈরি হয়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান ছিল এর ব্যতিক্রম নয়। কারও কাছে এটি ছিল কেবলই সরকার পতনের আন্দোলন; অন্যদিকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীসহ আরও অনেকের কাছে এর আক্ষরিক ও রূপক অর্থ ছিল—দেয়ালের লিখন পড়তে পারা, তথা ব্যাপক পরিবর্তনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা অনুধাবন করা। ৩ আগস্ট ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর উত্থাপিত দাবিগুলোর পাশাপাশি, আন্দোলনের চরম পর্যায়ে বিবেকবান সুশীল সমাজের সদস্যরাও একটি গণপরিষদ গঠন, নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের দাবি সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন। (মুক্তকণ্ঠ, ৪ আগস্ট ২০২৪)
বৈষম্যমূলক, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও নিপীড়নমূলক হয়ে ওঠা এই রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি আমূল পরিবর্তন নাগরিকেরা এবং আমি আগে যে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল বলে বর্ণনা করেছি, তাঁদের মধ্যে গভীরভাবে প্রতিফলিত ছিল।
বাংলাদেশে এ রকম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছিল ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময়ও। গণ–অভ্যুত্থানের পর তা একটি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত না হলেও, জনচেতনায় সেই পলিটিক্যাল কমিউনিটি বা রাজনৈতিক সম্প্রদায় সব ধরনের ভেদাভেদকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয় বলেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনায় নেতৃত্বের নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে সবাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেই কারণেই জনযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর ধারণা তৈরি হয়েছে, তা কেবল অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতার হিসাবে সীমিত থাকবে না।
.অভ্যুত্থান যে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের ব্যাপারে মানুষের মনে বিশাল প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, অভ্যুত্থানে নাগরিকেরা যুক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর অধীনে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনা এবং একটি লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থা সৃষ্টিকারী গভীর কাঠামোগত ত্রুটিগুলোর বিরুদ্ধে।
জনগণের সম্মতি ছাড়াই ক্ষমতায় টিকে থাকার সেই ব্যবস্থা—তার বিপরীতে এক সম্মিলিত রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল। এটি রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা; যার কেন্দ্রে আছে বিদ্যমান সংবিধানের অসংগতিগুলো দূর করে রাষ্ট্রের কাঠামোকে নতুন করে সাজানোর তাগিদ।
এই ঢেলে সাজানোই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। এর জন্য দরকার জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা; নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতার কুক্ষিগত হওয়া ঠেকানো এবং জনগণের ক্ষমতায়ন।
দীর্ঘ ৯ মাস ধরে ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নজিরবিহীন আলোচনার মধ্য দিয়ে রচিত দলিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ এই সংস্কারগুলোর কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গণভোটে নাগরিকদের বিপুল সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
.উপরন্তু ক্ষমতাসীনেরা এর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। কিন্তু রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার ও পুনর্গঠন যে জরুরি—এই বোধ এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা বা রাজনৈতিক বুলি নয়; বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের কাছে তা পৌঁছে গেছে। সাধারণ নাগরিকেরাও তাঁদের নিজেদের মতো করে বুঝতে পারছেন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কীভাবে ভোটাধিকার খর্ব করে, কেন স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ছাড়া ক্ষমতাসীনদের প্রভাব থেকে ভোটের অধিকার রক্ষা করা যায় না, ন্যায়বিচারের জন্য কেন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তার দোরগোড়ায় আদালতের উপস্থিতি দরকার।
তাঁরা এটাও বুঝতে পারেন যে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবের মধ্য দিয়ে যে বৈষম্য তৈরি করা হয়, তা দূর করতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের কতটা স্বাধীনতা দরকার। দুর্নীতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা ছাড়া চুরিতন্ত্র রোধ করা যাবে না বলেও তাঁদের উপলব্ধিতে এসেছে। প্রতি পাঁচ বছরে তত্ত্ববাধায়ক সরকার নিয়ে যে সংকট, তার স্থায়ী সমাধানই মানুষের প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার, জনপরিসরে আলোচনা এবং সুশীল সমাজের দাবিতে প্রতিধ্বনিত হওয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর বিভিন্ন সুপারিশে ব্যক্ত জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতির মূল ভিত্তি একটাই—জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করা। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান ছিল সার্বভৌমত্বের এক চূড়ান্ত প্রয়োগ, আর গণভোট ছিল তার আরেকটি দৃষ্টান্ত।
.জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি হলো এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, যা মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে আনবে, সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য কাজ করবে, রাষ্ট্রের চোখে সবার সমতা নিশ্চিত করবে এবং বৈষম্য দূর করবে। এই বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত; তাই এর মধ্য থেকে নিজের সুবিধামতো কেবল কিছু অংশ বেছে নিয়ে বাস্তবায়ন করা—এমন ভাবনা রাষ্ট্রসংস্কার ও কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রায়নকে অনীহায় ঠেলে দেবে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনাই তৈরি করেনি; এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে সামনে এনেছে, একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর রূপ তৈরি করেছে, জনগণের মধ্যে বিদ্যমান পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কাঠামোগত রূপ প্রদান করেছে এবং এগুলো বাস্তবায়নের তাগিদ তৈরি করেছে। এগুলো অচিরেই জনমানস থেকে অপসৃত হবে না; বরং এগুলোই রাজনীতি বিচারকের মানদণ্ডে রূপান্তরিত হবে। এই কারণেই জুলাই অভ্যুত্থান শেষ হয়ে যায়নি—আমরা বরং এক ‘দীর্ঘ জুলাইয়ের যুগে’ প্রবেশ করেছি।
আলী রীয়াজ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর।
মতামত লেখকের নিজস্ব