টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের সীমান্ত সড়ক নির্মাণের মাত্র তিন বছর পার হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে সমুদ্রের প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় সড়কের বিভিন্ন স্থানের ব্লক সরে যাচ্ছে এবং ঢেউ সরাসরি আঘাত হানছে মাটির বাঁধে। সড়কের ব্লক সরে যাওয়ার পাশাপাশি এলাকার প্রায় ৪০০ বসতঘর এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নির্মাণের মাত্র তিন বছরের মাথায় এমন পরিস্থিতি সরকারি প্রকল্পের ব্যর্থতা এবং উপকূলীয় সুরক্ষা পরিকল্পনার গুরুতর ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়।

এই দ্বীপের পশ্চিম, দক্ষিণ ও পূর্ব দিকের অন্তত সাত কিলোমিটার এলাকা বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত এবং পূর্ব দিকে আরও পাঁচ কিলোমিটার নাফ নদীর তীরবর্তী। গত এক দশকে পাউবো ও নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এই বাঁধ ও সড়ক মেরামতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে মেরামতের ইতিহাস খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২০ সালে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হলেও সেখানে নিয়মিত জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ত। পরবর্তীতে ২০২২ সালে প্রায় ১৫১ কোটি টাকা ব্যয় করে তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ওপর সীমান্ত সড়ক নির্মাণ করা হয়, যা এখন ঝুঁকির মুখে।

সংস্কার ও মেরামতের মাত্র দুই-তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পের অকার্যকর হয়ে পড়া স্বাভাবিক বিষয় নয়। প্রশ্ন উঠছে, পর্যাপ্ত মাঠ গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়াই কি এই বিশাল প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল? জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে, তবে এই অঞ্চলের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যগুলো পরিকল্পনা পর্যায়ে আমলে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল বলে মনে করা হয়।

বেড়িবাঁধের ক্ষতির ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাপন হুমকির মুখে। উচ্চ জোয়ারের লোনাপানি বাঁধ উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি প্লাবিত হচ্ছে এবং খেতের ফসল নষ্ট হচ্ছে। ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মনে। জানা গেছে, সক্ষমতা থাকা বাসিন্দারা ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি এখন আরও বেশি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সড়ক ও বেড়িবাঁধের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে যে, জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে মেরামতের কাজ শুরু হবে এবং নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সাগর শান্ত হলে স্থায়ী সংস্কার কাজ শুরু হবে। এই উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও, স্থায়ী সংস্কার দ্রুত ধসে পড়ার নজির এই প্রকল্পেই দুবার দেখা গেছে। তাই এবার স্থায়ী সংস্কারের আগে অত্যাধুনিক প্রকৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। কাজ শুরুর আগে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ সংস্থা দ্বারা পর্যালোচনা ও নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও তদারকিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করার কথা ভাবা প্রয়োজন।