জুমার নামাজ শেষে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাজারের বাইতুন নূর জামে মসজিদের পাশের খোলা জায়গায় একে একে জড়ো হন কয়েক শ মানুষ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বৃদ্ধ থেকে শুরু করে দিনমজুর, পথশিশু ও প্রতিবন্ধী—সবাই অপেক্ষায় থাকেন খাবারের জন্য। অল্প সময়ের মধ্যেই সবার পাতে ওঠে গরম ভাত, ডাল ও সবজি; কখনো থাকে গরু বা মুরগির মাংস, কখনো মিষ্টান্নও। এরপর নারী, পুরুষ ও শিশুরা সারিবদ্ধভাবে একসঙ্গে বসে খেতে শুরু করেন।
এ আয়োজন কোনো উৎসবের অংশ নয়। জনঅধিকার কল্যাণ সোসাইটি টানা চার বছর ধরে প্রতি শুক্রবার এভাবেই এক বেলার খাবার বিতরণ করে আসছে। সংগঠনের সদস্যদের ভাষায়, এটি ‘মানবতার ভাতের হাঁড়ি’। তাদের উদ্যোগে প্রতি সপ্তাহে তিন শতাধিক অসহায়, ছিন্নমূল, পথচারী, মুসাফির, নিম্ন আয়ের মানুষ, পথশিশু ও প্রতিবন্ধী এক বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়ার সুযোগ পান।
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, মসজিদের পাশের পরিচ্ছন্ন স্থানে নারী-পুরুষ-শিশুরা খাচ্ছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা ভাত ও তরকারি তুলে দিচ্ছেন নিয়ম মেনে। খাবার পরিবেশনেও ছিল যত্নের ছাপ। চাইলে দ্বিতীয়বারও খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল।
সেদিন খাবারের আয়োজন করেন তিতাস উপজেলার জিয়ারকান্দি গ্রামের নেদারল্যান্ডসপ্রবাসী মো. জুয়েল মোল্লা। তিনি জানান, বিদেশে থাকায় মায়ের জানাজায় উপস্থিত থাকতে পারেননি। দেশে ফিরে মায়ের স্মরণে জনঅধিকার কল্যাণ সোসাইটির সহযোগিতায় প্রায় ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে এ খাবারের আয়োজন করেন।
জুয়েল মোল্লা বলেন, ‘মায়ের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। এত মানুষের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে মনে হয়েছে, এর চেয়ে বড় শান্তি আর কিছু হতে পারে না।’
নিজেদের উদ্যোগে শুরু
জনঅধিকার কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি মো. আমান ভূঁইয়া ও কোষাধ্যক্ষ মো. বাহার উদ্দিন বলেন, ২০২২ সালের মে মাসের প্রথম শুক্রবার নিজেদের উদ্যোগে কয়েকজন মিলে এই কার্যক্রম শুরু করেন। পরে এটি নিয়মিত রূপ নেয়। দুই বছর পর ২৬ সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠে জনঅধিকার কল্যাণ সোসাইটি।
বর্তমানে অনেকেই প্রয়াত স্বজনদের স্মরণে বা বিশেষ উপলক্ষে সংগঠনটির মাধ্যমে খাবারের আয়োজন করেন। কেউ এগিয়ে না এলে সদস্যরাই নিজেদের অর্থে রান্না ও পরিবেশনের ব্যবস্থা করেন।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. কুতুব উদ্দিন বলেন, ‘প্রতি শুক্রবার আমরা অন্য সব কাজের আগে এই আয়োজনকে গুরুত্ব দিই। অন্যকে খাওয়ানোর মধ্যে যে মানসিক শান্তি আছে, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
‘এহানে আইলে মনে অয় দাওয়াতে আইছি’
৮০ বছর বয়সী সাহেরবান বিবি প্রতি শুক্রবারই তিতাস থেকে এখানে আসেন। তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘প্রত্যেইক শুক্রবার এহানে আইয়া গোশত, ভাত, তরকারি, ডাইল, খিরপিন্নি পেট ভইরা খাই। অন্য কোনো আয়োজনে গেলে আমাগো জাগা দেয় না, ধমক দেয়।’
প্রতিবন্ধী শিশু মামুন ইসলামের কণ্ঠেও কৃতজ্ঞতা, ‘যারা আমাগরে এমন মজার মজার খাওন খাওয়ায়, আল্লাহ তাগরে আরও ভালা করুক। এমন মজার খাবার আমাগরে কেউ দেয় না।’
সংসারে অভাব লেগেই থাকে নাঙ্গলকোটের বিধবা মাফেলা বেগমের। প্রতি শুক্রবার এক বেলার খাবারের আশায় তিনি এখানে আসেন। সেদিন পেট ভরে খেয়ে তাঁর মুখে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি।
কামারকান্দি গ্রামের অসহায় মোন্তাজ হোসেন বলেন, ‘এহানে আইলে মনে অয় দাওয়াতে আইছি। খুব যত্ন কইরা খাওন দেয়, ভালা ভালা খাওয়ায়।’
অনুদানের ওপর নির্ভর এ আয়োজন
আয়োজকেরা জানান, এখন মূলত মানুষের অনুদানের ওপর নির্ভর করেই প্রতি শুক্রবার খাবারের আয়োজন করা হয়। তবে দান না এলেও কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয় না। সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় বহন করেন।
স্থানীয় মাদ্রাসাশিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই উদ্যোগ চালিয়ে যেতে আয়োজকদের কষ্ট হচ্ছে। তবু তাঁরা থেমে যাননি।
বাইতুন নূর জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা মুফতি নেছার উদ্দীন আল মুস্তাফী বলেন, এটি শুধু খাবার বিতরণ নয়, এটি সদকায়ে জারিয়া। দেশ-বিদেশে থাকা যে কেউ চাইলে এতে অংশ নিতে পারেন। সামান্য সহযোগিতাও অনেক অসহায় মানুষের মুখে এক বেলা তৃপ্তির হাসি এনে দিতে পারে।
চার বছর ধরে প্রতি শুক্রবারের এই আয়োজন এখন শুধু খাবার বিতরণ নয়, দাউদকান্দির অসহায় মানুষের জন্য এক বেলার নিশ্চয়তা। মানুষের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ দীর্ঘদিন চলবে—এমন প্রত্যাশা আয়োজকদের।