খুলনার বৃক্ষমেলায় এবার বিদেশি ও দুর্লভ ফলগাছের প্রতি ক্রেতাদের প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। উচ্চমূল্য হওয়া সত্ত্বেও এসব গাছের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে চারার বিক্রি বেড়েছে। মেলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়েছে।
খুলনা জেলা প্রশাসন ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের যৌথ আয়োজনে গত ১১ জুন খুলনা সার্কিট হাউস মাঠে এই মেলা শুরু হয়, যা চলবে আগামী ১১ আগস্ট পর্যন্ত। মেলা শুরুর পর থেকে গত শুক্রবার রাত পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ৬৭ হাজার ১০২টি চারা বিক্রি হয়েছে, যার মোট বাজারমূল্য ৯৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা।
গত বছরের পুরো মেলায় বিক্রি হয়েছিল ৪৩ হাজার ৭২১টি চারা, যার মোট মূল্য ছিল প্রায় ৫৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। সেই তুলনায় এবার ২৩ হাজার ৩৮১টি চারা বেশি বিক্রি হয়েছে, যা বিক্রির পরিমাণে প্রায় ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি। মেলার দিন যত অতিবাহিত হচ্ছে, বিক্রির হার ততই বাড়ছে।
বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুক্রবার পর্যন্ত বনজ ৫ হাজার ৭১৩টি, ফলদ ১৮ হাজার ৮৭৩টি, ঔষধি ৩ হাজার ৩৭৬টি, শোভাবর্ধনকারী ১৭ হাজার ৬৩৫টি, ফুল ১৬ হাজার ৬৫৩টি এবং অন্যান্য ৪ হাজার ৮৫২টি চারা বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে ফলদ গাছের চাহিদাই ছিল সর্বোচ্চ। গত বছর বনজ ২ হাজার ১৭৭টি, ফলদ ১২ হাজার ৬১৯টি, ঔষধি ২ হাজার ৫৮১টি, শোভাবর্ধনকারী ১২ হাজার ৮৬৮টি, ফুল ১০ হাজার ৪২৭টি ও অন্যান্য ৩ হাজার ৪৯টি চারা বিক্রি হয়েছিল।
মেলায় পার্সিমন, রামবুটান, পিচ, অ্যাভোকাডো, জয়তুন, কোরিয়ান জাম, মাম্মি সফেদা, আচচাইরু, বেলজিয়াম লিচু, ভিয়েতনামি লাল ও পিংক কাঁঠাল, ডুরিয়ান, থাই লংগান, কফিগাছ, হরিমন-৯৯ আপেল, থাই বাতাবি, রুবি লংগান, কাজুবাদাম, লটকন, লাল শরিফা, আলুবোখারা, পিমপম লংগান, সুপার ভায়োগা, সাদা লংগান ও নাশপাতির মতো নানা বিদেশি জাতের গাছ ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে।
করিম নার্সারির স্বত্বাধিকারী মো. আকবার বিন ওসমানী জানান, এবার বিক্রি বেশ ভালো এবং মানুষ বিদেশি প্রজাতির গাছের প্রতি আগ্রহী। ইতিমধ্যে তাদের ২ হাজার ৩৬০টি গাছ বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, "একেকটি মাম্মি সফেদাগাছের দাম চাওয়া হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা। ফলসহ রামবুটান ২৫ হাজার, আপেল ২৬ হাজার, পার্সিমন ২৫ হাজার, পিচ ফল ১৫ হাজার, বেলজিয়াম লিচু ১২ হাজার, বলিভিয়ার আচচাইরু ১৫ হাজার, ডুরিয়ান ১২ হাজার এবং রুবি লংগান ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।"
অন্যদিকে, মালঞ্চ পুষ্পকেন্দ্র নার্সারির মালিক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, ক্রেতারা সাধারণত কম দামের গাছ বেশি কিনতে চান। তবে গতবারের চেয়ে এবার বেচাকেনা ভালো। তিনি বলেন, "এবার বেচাকেনা খারাপ নয়; বরং গতবারের চেয়ে ভালো। তবে মেলাটি শিববাড়ি মোড়ের জিয়া হল চত্বরে হলে বিক্রি আরও বেশি হতো। সন্ধ্যার পর অনেকে এখানে আসতে চান না।"
শনিবার দুপুরে দুই সন্তানসহ মেলায় আসা রুকাইয়া ইয়াসমিন ছয়টি গাছ কিনেছেন। তিনি বলেন, "কিছু গাছের দাম কম মনে হয়েছে। মেলায় অনেক জানা-অজানা গাছ দেখতে পেয়েছেন। বিদেশি অনেক ফলের গাছ দেখেছেন, যেগুলো সম্পর্কে জানলেও আগে কখনো গাছ দেখেননি।"
গাছ কেনাবেচার পাশাপাশি বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের ম্যানগ্রোভ সিলভিকালচার বিভাগের স্টলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রবেশমুখে থাকা এই স্টলে সুন্দরী, ভাতকাঠি, পশুরসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ চারা এবং বৈজ্ঞানিক নাম প্রদর্শিত হচ্ছে। এছাড়া ফরমালিনে সংরক্ষিত পশুর, বহেলা, কাঁকড়া ও সুন্দরী ফলের পাশাপাশি মাছ, সাপ, শামুক, ঝিনুক, চিংড়ি, কাঁকড়া এবং বাঘের মাথার খুলি প্রদর্শিত হচ্ছে।
স্টলটি পরিদর্শন করা শিক্ষার্থী অনিকা তাসনিম সুবহা বলেন, "সুন্দরবনের অনেক অজানা প্রাণী ও আগে না দেখা গাছের ফল সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। ভালো লাগছে।"
দর্শনার্থী শাওন বলেন, "সংরক্ষিত জিনিসগুলো দেখতে সুন্দর। এগুলো দেখলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাওয়া যায়।"