রোজারিওর মালভিনাস মাঠ। বিকেলের আলো নরম হতে হতে গ্যালারির ধারে এক লোকের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। মাঠের কোণে ছুটে বেড়ানো একরত্তি ছেলেটার দিকে চোখ—তারপর বলের পেছনে দৌড়। প্রতিবারের মতোই লোকটা থাকে ঠিক পেছনে, ঠিক তার ছায়ার জায়গাটায়। তিন দশক পেরিয়েও বদলাতে পারেনি সেই বিন্যাস; শুধু বদলেছে মাঠ আর বয়সের ব্যবধান—লোকটার জায়গা থেকে দূরে সরে যায়নি ছেলের ছায়া হয়ে থাকা মানুষটি।
অবশেষে সেই ছায়া সরে গেছে চিরতরে। রোজারিওতে ৬৮ বছর বয়সে হোর্হে মেসির হৃৎস্পন্দন থেমে গেছে। আর তার সঙ্গে থেমেছে ফুটবল ইতিহাসের এক নীরব, নেপথ্যের বড় অধ্যায়।
হোর্হে হোরাসিও মেসি নিজেও একদিন বল নিয়ে দৌড়াতেন নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের যুবদলে। তবে সামরিক চাকরির বাধ্যবাধকতা তাঁর স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রাসায়নিক প্রযুক্তিবিদ্যা পড়ে আশির দশকে তিনি আকিন্দার ইস্পাত কারখানায় ঢোকেন। বছরের পর বছর পরিশ্রম করে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ব্যবস্থাপক।
ছেলে যখন বলের সঙ্গে কথা বলতে শিখতে শুরু করল, সিনিয়র মেসি বুঝতে পারেন—এই ছেলেটা অন্যদের মতো নয়। কিন্তু প্রকৃতি তখন পরীক্ষা নিচ্ছিল ভিন্নভাবে। ১০ বছরেও মেসি লম্বা হচ্ছিলেন না। তখনই হোর্হে মেসি ডাক্তার দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। খবর খারাপ—মেসির শরীরে আর তৈরি হচ্ছে না বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় এক হরমোন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল, প্রতি মাসে পনেরো শ ডলারের একটি বিশেষ ইনজেকশন দিতে হবে। হোর্হে দরিদ্র ছিলেন না, তবে অত টাকা খরচ করার সামর্থ্যও তাঁর ছিল না। রোসারিওতে তিন তলা পৈতৃক বাড়ি আছে, সাধারণত টাকাপয়সা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমই। তবু মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মাসিক পনেরো শ ডলার ছিল বড় বোঝা। অথচ মেসি বড় হচ্ছেন, কিন্তু ঠিক বেড়ে উঠছেন না।
কারখানা থেকে সাহায্য নিয়ে এবং নিজের কিছু জমানো টাকা দিয়ে শুরুতে তিনি ইনজেকশনের খরচ জোগাড় করেন। তবে দিন দিন কাজটি কঠিন হয়ে ওঠে। নিওয়েলসের কাছে সাহায্য চাওয়া হলেও ১২ বছর বয়সী একজনের জন্য এত বড় বিনিয়োগ করার সামর্থ্য তাদের ছিল না।
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেসির ড্রিবলিং নিয়ে একটি ভিডিও তৈরি হয়। ধারণ করা হয়েছিল কমলা দিয়ে ১১৩, টেনিস বল দিয়ে ১৪০ আর টেবিল টেনিস দিয়ে ২৯টি ট্রিক। তখন ঘরে ঘরে এখনকার মতো ইন্টারনেট ছড়ায়নি। ভিডিওটেপ দেওয়া হয় রোসারিওর বাসিন্দা ব্যবসায়ী হোরাশিও গাহগিওলিকে।
গাহগিওলি স্পেনের বার্সেলোনায় ব্যবসা করতেন। তিনি টেপটি দেন হোসেপ মারিয়া মিনহেলা নামের এক এজেন্টকে। বার্সার সাবেক খেলোয়াড় ও ক্লাবকর্তা রেশাক মিনহেলার বন্ধু ছিলেন। মিনহেলা প্রস্তাব দিলেন ছেলে পছন্দ হলে ওর হরমোন চিকিৎসার দায়িত্ব ক্লাবকে নিতে হবে। পাশাপাশি বাবার জন্যও একটি চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। রেশাক মেসিকে সরাসরি দেখতে চাইলেন। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে জীবনে প্রথম উড়োজাহাজে চাপেন মেসি—সঙ্গে বাবা। গন্তব্য আটলান্টিকের অন্য পার।
মেসি যান বার্সেলোনায়। পরদিন দলের সঙ্গে প্রথম অনুশীলন করেন। মাঠে নেমে তিনি দেখান, ফুটবল নিয়ে কী করতে পারেন। কিন্তু নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বার্সেলোনা মেসির সঙ্গে চুক্তি করতে দেরি করছিল। কোনো সুরাহা হচ্ছে না বলে অধৈর্য হয়ে ওঠেন মেসির বাবা। এজেন্ট মিনহেলা রেশাককে চাপ দিতে থাকেন।
একদিন টেনিস খেলার ফাঁকে রেশাককে জানালেন—মেসির বাবা দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। রেশাক বুঝলেন, একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। একটা পেপার ন্যাপকিনে লিখলেন ‘এই ছেলেকে বার্সেলোনায় নেওয়া হলো’, দেন মিনহেলাকে। কে জানত, সেদিনের সেই তুচ্ছ পেপার ন্যাপকিন বদলে দেবে ফুটবল ইতিহাসকে!
বার্সেলোনার প্রথম বছরগুলো ছিল রূপকথার উল্টো পিঠ।
ভাষা অচেনা, বন্ধু নেই, মা-ভাইবোনেরা সমুদ্রের ওপারে। ২০০৭ সালে রেডিও দেল প্লাতাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি নিজেই বলেছিলেন সেই দিনগুলোর কথা—বাবা-ছেলে দুজনেই একা ঘরে গিয়ে কাঁদতেন, কিন্তু একে অপরকে বুঝতে দিতেন না।
দুজনেই ভান করতেন সব ঠিক আছে, অথচ ভেতরে-ভেতরে দুজনেই ভেঙে পড়তেন। একদিন হোর্হে মেসি ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—থাকতে চাও, নাকি ফিরে যেতে চাও দেশে? ছোট্ট লিও বলেছিলেন, থাকতে চান। আর বাবা থেকে গেলেন তাঁর পাশে। না হলে কি আজকের মেসির গল্প লেখা হতো—এটা বলা কঠিন।
চৌদ্দ বছর বয়সে ছেলের এজেন্ট হয়ে ওঠেন সিনিয়র মেসি, এবং সেই দায়িত্ব বহন করেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। বার্সেলোনার একের পর এক চুক্তি নবায়ন, পিএসজিতে নাটকীয় স্থানান্তর, শেষে ইন্টার মায়ামিতে যাত্রা—প্রতিটি বাঁকে ছিলেন তিনি, মাঠের বাইরের প্রতিটি লড়াইয়ের কান্ডারি। ব্র্যান্ড মেসিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষির টেবিলে বসিয়েছেন তিনিই।
তবে নিজের অংশটা ছিলেন অনেকটাই নীরব। বছরের পর বছর হাতে গোনা কয়েকটি সাক্ষাৎকার—এল গ্রাফিকো, জার্মানির কিকার, স্পেনের ইনফর্মে রবিনসন। ইনস্টাগ্রামে মাঝেমধ্যে পোস্ট দিতেন ছেলের সাফল্য নিয়ে; নাতি-নাতনি আর অন্য সন্তানদের নিয়ে পারিবারিক উৎসবের ছবিতেও দেখা যেত তাঁকে। বিশ্বকাপগুলোয় নিয়মিত দেখা যেত পুরো মেসি পরিবারকে গ্যালারিতে, আর সেটাই এবার ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর অনুপস্থিতিকে নজর এড়াতে দেয়নি কারও।
এই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই গোল করে কেঁদে ফেলেছিলেন মেসি। হ্যাটট্রিকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেছিলেন, খেলার সঙ্গে সম্পর্কহীন কিছু কঠিন দিন পার করছেন তিনি। সতীর্থ ও পরিবারের পাশে থাকাটাই তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে। পরে জানা যায়, হোর্হে মেসি অসুস্থ। কিছুদিন আগে মেসি পরিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, সিনিয়র মেসি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে আছেন, অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন।
ফুটবল ইতিহাস মনে রাখবে লিওনেল মেসির নাম, তাঁর বাঁ পায়ের জাদু, তাঁর ট্রফির সারি। কিন্তু যাঁরা কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন—সেই জাদুর প্রথম মুগ্ধ দর্শক ছিলেন একজন বাবা, যিনি নিজের স্বপ্ন, নিজের দেশ, নিজের স্বস্তির জীবন ছেড়ে ছেলের হাত ধরে হেঁটেছিলেন অনিশ্চয়তার দিকে। যিনি প্রতিটি ইনজেকশনের রাতে পাশে ছিলেন, প্রতিটি একলা কান্নার রাতে পাশে ছিলেন, প্রতিটি চুক্তির টেবিলে পাশে ছিলেন।
এখন থেকে যখনই লিওনেল মেসি মাঠে নামবেন, গ্যালারির কোথাও আর সেই চেনা মুখটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। হোর্হে মেসি নেই—তবু প্রতিটি গোল উদ্যাপনে, প্রতিটি ট্রফি উঁচিয়ে ধরায় রোজারিওর সেই ছেলেটার ভেতরে থেকে যাবেন চিরকাল, এক নীরব ছায়া হয়ে।