গাড়ির চেসিস, ইঞ্জিন ও বডি সাধারণ বাসের হওয়া সত্ত্বেও বিআরটিএ-র নিবন্ধনের পর নকশা বদলে তৈরি করা হচ্ছে ‘ডাবল ডেকার স্লিপার বাস’। কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কাঠামোগত পরিবর্তন এনে ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে চলাচল করছে এসব বাস। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার সকালে ওসমানীনগরে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে, যেখানে বেঙ্গল পরিবহনের একটি স্লিপার বাসের ধাক্কায় ইউনিক পরিবহনের ৯ জন যাত্রী প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ২৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৪ বছরের এক শিশু ও ২৫ বছর বয়সি এক নারী রয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পেছনের গাড়ির ড্যাশ-ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বেঙ্গল পরিবহনের ওভারস্পিডিং ও অনিয়ন্ত্রিত গতির কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি বিপরীত লেনে চলে আসে এবং সজোরে ধাক্কায় ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়ক থেকে ছিটকে পাশের ধানক্ষেতে আছড়ে পড়ে।

ঘটনা প্রসঙ্গে শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, “বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসটি অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল। বিপরীত লেনে ঢুকে ইউনিক পরিবহনের বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দিলে সেটি ধানক্ষেতে গিয়ে পড়ে। দুর্ঘটনায় নিহত সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী ছিলেন।”

এই দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে স্লিপার বাসের চলাচল নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেঙ্গল পরিবহনের এই বাসটি সাধারণ এসি পরিবহন হিসেবে নিবন্ধন পেলেও ‘ডাবল ডেকার স্লিপার’ হিসেবে চলাচলের কোনো অনুমতি নেই। এছাড়া ‘প্যারাডাইস পরিবহন’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনহীন স্লিপার বাসও এই মহাসড়কে চলাচল করছে।

সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক পলাশ বলেন, “স্লিপার বাস হিসেবে যেগুলো চলে, সেগুলোর চেসিস ও বডি সাধারণ বাসের। ফলে জরুরি বা ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে এসব গাড়ি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে না, যা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।”

বিআরটিএ সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) আব্দুর রশিদ দেশে কোনো স্লিপিং বাসের অনুমোদন নেই বলে নিশ্চিত করে জানান, “মালিকেরা সাধারণ এসি বাস হিসেবে ফিটনেস নিয়ে পরে ভেতরে পরিবর্তন আনেন। গাড়ির মূল নকশা পরিবর্তন করা হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।” নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এসব বাস কীভাবে চলছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, “ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ধরা পড়লে জরিমানা করা হয়, এর চেয়ে বেশি কিছু সম্ভব হয় না।” তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর বাস দুটির ঢাকা মেট্রো অফিসকে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং শনিবার বাস দুটির লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করে মালিককে ৫ দিনের মধ্যে কাগজপত্রসহ উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

তবে সিলেট হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম দাবি করেন, “এসি স্লিপার বাস অবৈধ—বিআরটিএ থেকে আমাদের এমন কোনো নির্দেশনা বা চিঠি দেওয়া হয়নি। চিঠি দিলে আমরা ব্যবস্থা নিতাম।”

প্রশাসনের এই দাবি নাকচ করে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল হক অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসব অবৈধ বাস চলাচলের সুযোগ দেন এবং বিআরটিএ ও পুলিশের চোখের সামনেই এগুলো চলে। তিনি আরও বলেন, “শুক্রবারের ঘটনার সম্পূর্ণ দায় বেঙ্গল পরিবহনের।”