ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তাঁদের সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্রনেতারাও ছিলেন।
জুলাই জাদুঘরের ‘লাল টেলিফোন কক্ষে’ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও শোনেন এনসিপি ও ছাত্রনেতারা। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ওই কক্ষে গিয়ে লাল টেলিফোনে কান পাতেন এবং নম্বর ডায়াল করে কথোপকথন শোনেন। এ সময় এনসিপির নেতা সাইফুল্লাহ হায়দার ব্যঙ্গাত্মকভাবে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার আহ্বান জানান। পরে তাঁরা জাদুঘরের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গত ৫ আগস্ট জুলাই জাদুঘরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, আজ শনিবার সকাল নয়টার দিকে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে জুলাই জাদুঘরে আসেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ দলটির অর্ধশতাধিক নেতার প্রতিনিধিদল। তখনও জনসাধারণের জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত হয়নি।
নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সকালে জুলাই জাদুঘর প্রাঙ্গণে আসেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলম, মাহিন সরকার, সারোয়ার তুষার, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদারসহ কয়েকজন।
প্রথমে তাঁরা জাদুঘর চত্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের বর্ণনাসংবলিত গ্রাফিতি, আলোকচিত্র, জাদুঘরের সামনে থাকা প্রতীকী কবর এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন আইকনিক ছবির আদলে নির্মিত ভাস্কর্য ঘুরে দেখেন।
একপর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনসহ আরও কয়েকজন এসে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হন। সকাল সোয়া নয়টার দিকে তাঁরা মূল জাদুঘরে ঢোকেন। জাদুঘরের ফটকে ঢুকতেই দেখা যায় থ্রিডি প্রজেকশনের মাধ্যমে গণভবনের ৫ আগস্ট-পরবর্তী অবস্থা। এরপর প্রথম কক্ষে ছিল ‘শেখ হাসিনার সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অপকর্ম ও ভূমিকার’ একটি সংক্ষিপ্ত অ্যানিমেশন ভিডিও, পাশে ছিল প্রতীকী খুলি।
প্রথম কক্ষটি ঘুরে দেখার পর এনসিপি নেতারা ডান দিকের একটি কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে মেঝেতে শক্ত কাচের নিচে রাখা আছে ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ ছাত্র–জনতার হাতে চুরমার হওয়া তৎকালীন গণভবনের ইট–পাথর, কাচ ইত্যাদি। কক্ষটিতে আওয়ামী লীগ শাসনামলের বিভিন্ন আলোকচিত্র, গণভবন থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন ফাইলের কপি রয়েছে। এ ছাড়া ডিজিটাল স্ক্রিনে চলছিল জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ।
ওই কক্ষ থেকে পেছনের দিক দিয়ে এনসিপির নেতারা আরেকটি অংশে প্রবেশ করেন। সেখানে ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড, ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি ২০১৯ সালে বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতীকী উপস্থাপন, রাজনৈতিক দলের ওপর দমন–পীড়নের বিভিন্ন আলোকচিত্রের সংগ্রহ রয়েছে। ওই অংশে একটি ছোট ডিজিটাল স্ক্রিনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার বক্তব্যের বিভিন্ন ক্লিপ চলছিল।
এরপর তাঁরা জাদুঘরের দক্ষিণ দিকের অংশে যান। ওই অংশটিতে আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিক্যাপিংসহ (কোনো ব্যক্তির হাঁটু বা পায়ের সংযোগস্থলে অস্ত্র দিয়ে গুলি করে বা আঘাত করে স্থায়ীভাবে পঙ্গু করে দেওয়া) ভয়াবহ নির্যাতন ও গুমের চিত্র এনসিপির নেতারা ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। এরপর তাঁরা ‘লাল টেলিফোন কক্ষে’ যান। ওই কক্ষটি ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অফিসকক্ষ। সেখানে তিনটি আলাদা টেবিলে ছয়টি লাল টেলিফোনের সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের নাম ও নম্বরের তালিকা আছে। নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করলে নির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথন শোনা যায়।
জুলাই জাদুঘরের নিচতলা ঘুরে দেখার পর সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে দ্বিতীয় তলায় ওঠেন এনসিপির নেতারা। দ্বিতীয় তলায় উঠে ডান দিকে প্রথম যে কক্ষটিতে তাঁরা প্রবেশ করেন, সেখানে চারদিকের দেয়ালে পর্দায় ছিল জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ। নাহিদসহ এনসিপির নেতারা কিছুক্ষণ ওই ভিডিওগুলো দেখেন।
ওই কক্ষটির পাশের অংশে রয়েছে আলোচিত কার্টুনিস্ট দেবাশিস চক্রবর্তীর তৈরি করা ‘জুলাইয়ের পোস্টারের’ সংগ্রহ। সেখানে জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের পরিচয়পত্র, হাতঘড়ি, মুঠোফোন, টুপি, জার্সি, গামছা, ওয়ালেট, জ্যাকেট, প্যান্ট, কোট, টাই ও শার্টের পাশাপাশি শহীদ শ্রমজীবীদের ছবির সংগ্রহ, জুলাইয়ের সাংস্কৃতিক কর্মীদের ছবির সংগ্রহ রয়েছে। এসবের সঙ্গে পাশে থাকা ‘জুলাইয়ের টাইমলাইন’ও ঘুরে দেখেন এনসিপির নেতারা।
এই অংশে একটি কক্ষে জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকাসংক্রান্ত বিভিন্ন আলোকচিত্র স্থান পেয়েছে। নাহিদসহ এনসিপি নেতারা যখন ওই অংশটি ঘুরে দেখছিলেন, তখন (১০টা) সেখানে আসেন এনসিপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম।
এনসিপি নেতারা সবশেষ জাদুঘরের যে অংশে প্রবেশ করেন, সেটি মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন–সংক্রান্ত। সেখানে কয়েকটি কক্ষে ও বাইরে শহীদকে বহনকারী রিকশা, শহীদদের জুতা, বই, সুরমা, রবিক্স কিউব, ভলিবল, গ্লাভস, কাপ, মগ, কাপ–পিরিচ, প্লেট, চশমা ইত্যাদির সংগ্রহ ঘুরে ঘুরে দেখেন তাঁরা। দ্বিতীয় তলার একদম শেষ প্রান্তে শেখ হাসিনার পাঠকক্ষও ঘুরে দেখেন এনসিপি নেতারা। সেখানে শহীদ আবু সাঈদের পড়ার টেবিল ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতার লেখাগুলো জুলাই জাদুঘরের দেয়ালে দেয়ালে সেভাবেই রাখা হয়েছে। ঘুরে দেখা শেষে ১০টা ১০ মিনিটে নাহিদসহ এনসিপির নেতারা মূল জাদুঘর থেকে বের হন। এরপর তাঁরা জাদুঘর চত্বরে থাকা প্রতীকী আয়নাঘর, টিএফআই সেল, এগজস্ট ফ্যান পরিদর্শন করেন। শেষে চত্বরে থাকা জুলাই অভ্যুত্থানের এক দফা দাবি ঘোষণার ছবির গ্রাফিতি পরিদর্শন করেন এনসিপির নেতারা। এরপর তাঁরা জাদুঘর কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। সেখানে প্রায় আধ ঘণ্টা আলোচনার পর বেলা ১১টায় জাদুঘরের মূল ফটকে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদসহ দলটির নেতারা।
জুলাই জাদুঘরে ভারতীয় আগ্রাসনের চিত্র নেই, বিএনপি হয়তো ভয় পাচ্ছে: নাহিদ ইসলাম