পাকিস্তানের ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে ‘সিকিউরিটি স্টেট’ জনগণকে সুবিধাজনকভাবে দুটি ভাগে রেখেছে—আজ্ঞাবহ ও বিপজ্জনক। ভৌগোলিক অবস্থান, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে এই ভাগাভাগির ভাষাও বদলেছে। কখনো ‘ভালো তালেবান’ ও ‘খারাপ’ তালেবান; কখনো ‘ভালো’ বেলুচ ও ‘খারাপ’ বেলুচ; ‘দেশপ্রেমী’ পশতু বনাম বিদেশি ‘মদদপুষ্ট পশতু’; ‘বীর কাশ্মীরি’ বনাম ‘সন্দেহভাজন’ কাশ্মীরি।

সাম্প্রতিক সময়ে আবার ইমরান খানের ‘গ্রহণযোগ্য সমর্থক’ এবং ‘অগ্রহণযোগ্য সমর্থক’—প্রথম ধরনের সমর্থকদের ভয় দেখিয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে, আর দ্বিতীয়রা এখনও যথেষ্ট ভেঙে না পড়ায় আত্মসমর্পণ করেনি। এখানে ‘ভালো’ বলতে শান্তিপ্রিয়, গণতান্ত্রিক বা আইন মেনে চলা মানুষের কথা বলা হয় না। ‘ভালো’ মানে, রাষ্ট্রের কাজে লাগে এমন মানুষ। তবে বর্তমান সামরিক শাসনব্যবস্থা এখন এক গুরুতর সংকটে পড়েছে—তাদের ‘ভালো পাকিস্তানি’ ফুরিয়ে আসছে।

বেলুচিস্তানে কারা সশস্ত্র আন্দোলন গোপনে উসকে দিচ্ছে—এ প্রশ্নের বাইরে, ক্ষোভ-দাবি ও স্মৃতি মিলিয়ে উত্তেজনার ক্ষেত্রটা তৈরি হয়েছে। পশতুদের স্মৃতি আছে; দরিদ্র মানুষের হাতে বিদ্যুতের বিল; ভূমিহীনরা বুঝে গেছে দেশপ্রেমের ভাষণ দিয়ে বাড়িভাড়া পরিশোধ করা যায় না। সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তুলছেন; বিচারকেরাও মাঝে মধ্যে ভাবছেন, তাঁরা আসলে বিচারক কি না। আর ইমরান খানের সমর্থকেরা এখনো সেই ‘বিপজ্জনক’ বিশ্বাস ধরে রেখেছেন যে নির্বাচনে ভোটারের মতামতই নির্ধারক হওয়া উচিত।

এরপর কাশ্মীরিরা সবচেয়ে বড় আদর্শিক ‘অপরাধ’টি করে ফেলেছে—তারা শুধু ভারতের কাছে নয়, পাকিস্তানের কাছেও নিজেদের অধিকার দাবি করতে শুরু করেছে। ফলে জাতীয় জরুরি অবস্থা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কারণ এখন সবাই রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে।

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অস্থিরতা বহুদিনের একটি প্রতারণাকে অসাধারণ স্পষ্টতায় উন্মোচন করেছে। দশকের পর দশক ইসলামাবাদ ‘আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর’কে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিপরীত এক আদর্শ চিত্র হিসেবে তুলে ধরেছে—ভারতের সামরিকীকরণের বিপরীতে শান্তিপূর্ণ এবং ভারতের দমন-পীড়নের বিপরীতে প্রতিনিধিত্বশীল।

এটা ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের যত্নে রাখা প্রদর্শনীগুলোর একটি—কাচের বাক্সে সংরক্ষিত এক ‘আদর্শ অঞ্চল’, যেখানে সম্ভব হলে কাশ্মীরিদের নিজেদের ছাপও রাখা হবে না। কিন্তু সেই প্রদর্শনীই কথা বলতে শুরু করেছে। এগুলো রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া। আর ‘সিকিউরিটি স্টেট’–এর বিশ্লেষণের ঝুলিতে কার্যকর করার মতো একটিই হাতিয়ার আছে—লাঠির আকৃতি।

জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নেতাদের খুঁজে বেড়ানো হয়েছে। সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। ইন্টারনেট–সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। আর মৃত্যু, গ্রেপ্তার, বয়কট ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।

তথ্য-অবরোধ (ব্ল্যাকআউট) কেবল তথ্যের অনুপস্থিতি নয়। এটি হলো সাক্ষীহীন ক্ষমতা—যার মাধ্যমে রাষ্ট্র এমন ঘটনা অস্বীকার করতে পারে, যা সাংবাদিকেরা যাচাই করতে পারেন না; পরিবারগুলো বাইরে জানাতে পারে না; আর অনিশ্চয়তাকেই নির্দোষতার প্রমাণে দাঁড় করাতে পারে। কর্তৃপক্ষ প্রথমে আলো নিভিয়ে দেয়, তারপর অন্ধকারে কী ঘটেছে—তার প্রমাণ চায়।

যখন আল–জাজিরার প্রতিবেদনে নির্বাচন বর্জন, জনশূন্য সড়ক এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের প্রকাশ্য অনাস্থার চিত্র উঠে আসে, তখন তাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিক্রিয়াটি প্রায় কাব্যিক—আয়নায় যদি নিজের মুখ দেখা যায়, তবে আয়নাকেই গ্রেপ্তার করো।

পাকিস্তানের শাসকেরা এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বলেন। এই স্লোগান এখনও রপ্তানিযোগ্য—শুধু নিজেদের দেশে এর চর্চা নিষিদ্ধ। পাকিস্তান কাশ্মীরিদের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। তারা সমর্থন করে সামরিক অনুমোদনপ্রাপ্ত কাশ্মীরি ক্ষোভকে।

রাষ্ট্রের অনুমোদিত কাশ্মীরিরা দিল্লির নিন্দা করতে পারে, বিদেশে মুক্তির ডাক দিতে পারে, নির্দেশমতো প্রতিরোধের অভিনয় করতে পারে। কিন্তু সে মুজাফফরাবাদের ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না। সে আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি করতে পারবে—তবে নিজের বাসভূমি ছাড়া অন্য সব জায়গার জন্য।

অচিরেই হয়তো আর কোনো ‘ভালো’ পাকিস্তানি অবশিষ্ট থাকবে না—থাকবে শুধু সন্দেহভাজন মানুষ, যারা শ্রেণিবিন্যাস, শাস্তি এবং নীরবতার দেশপ্রেমী শিষ্টাচার শেখার অপেক্ষায় থাকবে। এর অর্থ এই নয় যে ‘সিকিউরিটি স্টেট’ তার শত্রুদের পরাজিত করেছে; বরং এর অর্থ হবে, তারা পুরো দেশকেই নিজেদের শত্রুতে পরিণত করেছে।

ইসলামাবাদ প্রতিরোধের নাটক চায়, কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের বাস্তবতা চায় না। কাশ্মীরিরা তখনই কথা বলতে পারবে, যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাকে সংলাপ, মঞ্চ এবং খলনায়ক—সবকিছু সরবরাহ করবে। এখন এই নীতিই পুরো পাকিস্তান রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। যুক্তি নির্মম হলেও কার্যকর। বিক্ষোভকারীদের দাবির জবাব দিতে হয়; কিন্তু সন্ত্রাসীদের কেবল দমন করলেই চলে। সংস্কার কঠিন; গোলাবারুদ সহজ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতাকে ঢেকে দিয়েছে ভুক্তভোগীদের অপরাধী বানিয়ে।

এই ব্যবস্থার শীর্ষে আছেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। বিদেশে তাঁকে কৌশলবিদ, মধ্যস্থতাকারী ও স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ দেশে ‘স্থিতিশীলতা’ ক্রমেই এমন এক অবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি দেশকে মাটিতে চেপে ধরে বলা হচ্ছে, আর নড়াচড়া করবে না।

যে নাগরিকেরা ভোটাধিকার, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ বা সাংবিধানিক সরকার দাবি করেন, তাঁদের হুমকি হিসেবে দেখা হয়। আর তাঁদের দমনের দায়িত্বে থাকা সেনাপ্রধান এক রাজধানী থেকে আরেক রাজধানীতে ঘুরে বেড়ান একজন যুক্তিবাদী নেতা হিসেবে, যিনি নাকি এক ‘অযৌক্তিক’ জাতিকে সামলাচ্ছেন। একজন শক্তিমান শাসকের বৈধতা থাকা জরুরি নয়, যদি তিনি কৌশলগতভাবে উপযোগী হন!

বিদেশি নেতাদের সঙ্গে করমর্দন যেন আমদানিকৃত নির্বাচনী ম্যান্ডেটে পরিণত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট, রাজা কিংবা জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠককে জনগণের সম্মতির বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহারযোগ্য; সেনাবাহিনী ব্যবহারযোগ্য; মধ্যস্থতা ব্যবহারযোগ্য। এমনকি নির্বাচিত প্যাকেজ অনুযায়ী সার্বভৌমত্বও দর–কষাকষির বিষয় হতে পারে।

এদিকে ইমরান খান কারাগারে। কারণ, তিনি সামরিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গভীর দুর্বলতাটিই প্রকাশ করে দেন—জোরজবরদস্তি দিয়ে ভূখণ্ড, টেলিভিশন স্টেশন কিংবা আদালত দখল করা যায়, কিন্তু মানুষের আনুগত্য সৃষ্টি করা যায় না। যে ব্যক্তি আগুন লাগিয়েছে, সেই নিজেকে এখন ‘ফায়ার সার্ভিসের প্রধান’ ঘোষণা করেছে।

যে রাষ্ট্র বেলুচদের ভিন্নমতকে রাষ্ট্রদ্রোহ, পশতুদের ভিন্নমতকে সন্ত্রাসবাদ, নির্বাচনী ভিন্নমতকে দেশদ্রোহ এবং কাশ্মীরিদের ভিন্নমতকে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দেয়, সেই রাষ্ট্র জাতিকে রক্ষা করছে না; বরং জাতির কাছ থেকে নিজের সদর দপ্তরকে রক্ষা করছে।

পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীর কেন অশান্ত হয়ে উঠল

অচিরেই হয়তো আর কোনো ‘ভালো’ পাকিস্তানি অবশিষ্ট থাকবে না—থাকবে শুধু সন্দেহভাজন মানুষ, যারা শ্রেণিবিন্যাস, শাস্তি এবং নীরবতার দেশপ্রেমী শিষ্টাচার শেখার অপেক্ষায় থাকবে। এর অর্থ এই নয় যে ‘সিকিউরিটি স্টেট’ তার শত্রুদের পরাজিত করেছে; বরং এর অর্থ হবে, তারা পুরো দেশকেই নিজেদের শত্রুতে পরিণত করেছে।

  • জুনাইদ এস. আহমদ আইন, ধর্ম ও বৈশ্বিক রাজনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি পাকিস্তানের ইসলামাবাদভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব ইসলাম অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশনের পরিচালক। তিনি ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট ফর আ জাস্ট ওয়ার্ল্ড, মুভমেন্ট ফর লিবারেশন ফ্রম নাকবা এবং সেভিং হিউম্যানিটি অ্যান্ড প্ল্যানেট আর্থের সদস্য।

    ডন থেকে নেওয়া