সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে কোরআনে হাফেজসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকালে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের এই ভয়াবহ সংঘর্ষে নিহতরা সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী বলে জানা গেছে।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে হাজি সাইফুল ইসলাম, সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমা থানার চণ্ডীপুল এলাকার জাহাঙ্গীরের চার বছরের মেয়ে ফাইজা, সিলেটের সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম, কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চণ্ডিবের গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন, কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার শেরপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ইমন এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার ষাইধার (আটরামপুর) গ্রামের রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে রুবেল সূত্রধর।
এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন মুহাম্মাদ আরমান হুসাইন, যিনি ঢাকার নড়াইবাগ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে (মিযান জামাত) পড়ছিলেন। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলামের বড় ছেলে আরমান হাফেজ হয়ে উচ্চশিক্ষার পথে এগোচ্ছিলেন। রাজমিস্ত্রির কাজ করে ছেলেকে মাওলানা-মুফতি বানানোর স্বপ্ন দেখছিলেন বাবা।
সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়া রফিকুল ইসলাম বিলাপ করে বলেন, “আমি আমার ছেলেকে বলতাম–তোর জন্ম শুক্রবারে, মৃত্যু হলেও যেন শুক্রবারেই হয়। আরও বলতাম, বাবা, শুক্রবারে বেশি বেশি নবীজির ওপর দুরুদ পড়বি। আমি আমার ছেলেকে হাফেজ, মাওলানা ও মুফতি বানাতে চেয়েছিলাম। ঢাকায় পড়াশোনা করাচ্ছিলাম। আল্লাহর কাছে এমনই নিয়ত করেছিলাম।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ নিয়ে গেছেন, আল্লাহ নিয়ে গেছেন। আমার ছেলে কোরআন তেলাওয়াত করত, আল্লাহ আল্লাহ করত। ইনশাআল্লাহ, আমার ছেলে নবীর দরবারের পথে রওনা হয়েছে। ছেলে আর নেই, ছেলে আর নেই। দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। আল্লাহ নিয়ে গেছেন।”
দুর্ঘটনায় অন্তত ২৪ জন যাত্রী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৪ জন বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনীর জানান, ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে ১৬ জনকে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে একজনকে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং আরেকজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি বলেন, “নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি তিনজনের মধ্যে একজনের সিটিস্ক্যান রিপোর্ট স্বাভাবিক এসেছে। একজনের সিটিস্ক্যান এখনো সম্পন্ন হয়নি এবং আরেকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।”
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ড্যাশক্যাম ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যে জানা গেছে, বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসটি একটি পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত লেনে চলে আসে এবং তীব্র গতিতে ইউনিক পরিবহনের বাসের সামনের ডান পাশে ধাক্কা দেয়। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি পাশের খাদে পড়ে যায়।
আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি হতাহতদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার কথা জানান এবং পুলিশ আইনি পদক্ষেপ নেবে বলে উল্লেখ করেন।