ছুটির দিনে রাজধানীর জুলাই ৩৬ গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। শুক্রবার বেলা তিনটায় জাদুঘর খোলার কথা থাকলেও মূল ফটকের বাইরে তার আগেই দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ফলে টিকিটের অপেক্ষা ও গরমে ভোগান্তি বাড়ে।

গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী এবং গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন ঘুরে দেখতে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ আসেন। তবে অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপে ব্যবস্থাপনায় কিছুটা বিশৃঙ্খলাও দেখা গেছে।

বেলা আড়াইটার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, জাদুঘরের মূল প্রবেশ ফটকে টিকিটের জন্য শত শত মানুষ দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করছেন। প্রচণ্ড গরমে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে দুর্ভোগে পড়েন অনেকে। অপেক্ষমাণ কয়েকজন জানান, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট মিলছিল না। একপর্যায়ে উত্তেজিত কয়েকজন জোর করে টিকিট কাউন্টারের ভেতরে ঢুকে পড়েন। পরে দায়িত্বরত নিরাপত্তারক্ষীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।

রাজধানীর পল্লবী থেকে পরিবার নিয়ে আসা আজাদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বাচ্চা নিয়ে আধা ঘণ্টার বেশি রোদে দাঁড়িয়ে আছি। টিকিট পাইনি এখনো।’

মূল প্রবেশ ফটকে টিকিট না পেয়ে অনেকে বের হওয়ার গেট দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করলে সেখানে ভিড় আরও জমে। জাদুঘরের কর্মীরা তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। এ সময় নিরাপত্তারক্ষীদের উদ্দেশ করে এক দর্শনার্থী বলেন, ‘ছুটির দিনে একটু সুযোগ তো দিতে হয়। এতগুলো মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তারা কি কিছুই দেখবে না?’

বেলা তিনটার পরপরই টিকিট বিক্রি শুরু হয় এবং দর্শনার্থীরা ভেতরে ঢুকতে শুরু করেন। জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, শহীদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী, নথিপত্র, ভিডিও চিত্র এবং ঘটনার ধারাবিবরণী প্রদর্শন করা হচ্ছে।

জাদুঘরের ভেতরে রাজবাড়ী থেকে আসা মো. হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় একটা কাজে এসেছিলাম। ভাবলাম, একনজর দেখেই যাই কী রকম বানাল।’

তিনি জানান, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সাভারে অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন মো. রাকিব নামের একজন। আজ জাদুঘর দেখতে এসেছেন তিনি। মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে এসে ভালো লাগছে। পুরোনো ঘটনাগুলো আবার দেখলাম। এমন জায়গা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত।’

সেই সময়েই জাদুঘর ঘুরে বের হচ্ছিলেন দুই নারী দর্শনার্থী। এক নারী দর্শনার্থীকে পাশের আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আপা, আগে তো প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি কেউ দেখারও সাহস করত না। আজকে দেখেন, আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি।’

তথ্য পাওয়া নিয়ে ভোগান্তি

জাদুঘরের অভ্যন্তরে প্রতিটি কক্ষেই জাদুঘরের নিজস্ব লোকবল নিয়োজিত ছিল। তাদের পদবি ‘স্টোরিটেলার’ (বর্ণনাকারী)। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, দায়িত্বে থাকা স্টোরিটেলারদের কাছ থেকে তথ্য জানতে চেয়েও তাঁরা পাননি। মুক্তকণ্ঠের এই প্রতিবেদকও চারজন স্টোরিটেলারের কাছে জাদুঘর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে চাইলে তা পাননি।

জাদুঘর সূত্র জানায়, অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপ সামাল দিতে গতকাল রাতেই তড়িঘড়ি করে ২০ জন স্টোরিটেলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন স্টোরিটেলার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আজই আমাদের প্রথম দিন। এখনো কোনো প্রশিক্ষণ পাইনি। তাই অনেক বিষয়ই জানি না। তবে দুই-এক দিনের মধ্যে বিষয়গুলো জেনে নিতে পারব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সদ্যবিদায়ী মহাপরিচালক ও জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে স্টোরিটেলিং কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপের কারণে আপাতত তাঁদের ক্রাউড ম্যানেজমেন্টের (ভিড় সামলানোর) কাজে নিয়োজিত রাখা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে স্টোরিটেলিং কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। তখন তাঁরা সুশৃঙ্খলভাবে দর্শনার্থীদের তথ্য দিতে পারবেন।

শহীদের বাবার অভিযোগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হন রাজধানীর রায়েরবাগের আবদুর রহমান জিসান। তাঁর বাবা বাবুল সরকার আজ এসেছিলেন জাদুঘর ঘুরে দেখতে। তাঁর অভিযোগ, ছেলের ব্যবহৃত বিভিন্ন স্মারক জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে দিলেও সেগুলো প্রদর্শন করা হয়নি।

বাবুল সরকার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ছেলের জুতা, মাথায় বাঁধা পতাকা, কাপড়—সবই দিয়েছি। কিন্তু ভেতরে ঘুরে কোথাও সেগুলো দেখতে পাইনি। পুরো জাদুঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেছি।’