সাভারে পুলিশের তল্লাশি অভিযান চলাকালীন বহুতল ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মনোয়ার হোসেন বকশী (২৭) নামে এক ছাত্রদল নেতার রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার না করেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দিবাগত রাতে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) আবাসিক এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। নিহত মনোয়ার সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি এবং বিপিএটিসির নিরাপত্তা প্রহরী মুহম্মদ জাফর আলীর ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রাত ১২টার দিকে পুলিশের একটি দল বিপিএটিসি আবাসিক এলাকার ওই বাসায় তল্লাশি চালাতে যায়। তল্লাশির একপর্যায়ে এক পুলিশ সদস্য দ্রুত ছাদে ওঠেন। এর কিছুক্ষণ পর নিচে বিকট শব্দে কিছু পড়ার আওয়াজ পান স্বজন ও প্রতিবেশীরা। নিচে গিয়ে তারা মনোয়ার হোসেন বকশীকে রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার পরপরই পুলিশ সদস্যরা তাকে উদ্ধার না করে স্থান ত্যাগ করেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশের দাবি, প্রেমের সম্পর্কের জেরে মিমি আক্তার নামে এক তরুণীকে পীরগঞ্জ থেকে সাভারে নিয়ে আসেন মনোয়ার হোসেনের ভাগনে সৌমিক। এই ঘটনায় পীরগাছা থানায় একটি নিখোঁজ জিডি দায়ের করা হয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তের অবস্থান শনাক্ত করে পীরগঞ্জ ও সাভার মডেল থানার পুলিশ বিপিএটিসি এলাকায় সৌমিকের মামা মনোয়ার হোসেনের বাসায় অভিযান চালায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে মনোয়ার ছাদে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ যখন ছাদে তল্লাশি চালাতে যায়, তখন তিনি হঠাৎ নিচে পড়ে যান। তবে সৌমিক ও তার প্রেমিকা এর আগেই বাসা থেকে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
নিহতের বাবা মুহম্মদ জাফর আলী অভিযোগ করে বলেন, "পুলিশের তল্লাশির সময় আমার ছেলে ছাদ থেকে পড়ে যায়। পুলিশ তাকে উদ্ধার না করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। আমি আমার ছেলে হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে বিচার দাবি করছি।"
ঢাকা জেলা ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুজন সিকদার বলেন, "পুলিশের তল্লাশির সময় এই ঘটনা ঘটে। সে যদি ছাদ থেকে পড়েও যায় বা দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া পুলিশের দায়িত্ব ছিল। কিন্তু পুলিশ তা না করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ফেলে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছে। এতে পুরো ঘটনা নিয়ে মারাত্মক সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।"
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, "রংপুরের পীরগঞ্জ থানা থেকে এসআই কনক কান্তি বড়ুয়ার নেতৃত্বে একটা টিম আসছিল। বাইরে থেকে টিম আসলে তো আমাদের রিকুইজিশন দেয় যে, তারা ভিকটিম উদ্ধার করতে আসছে। পরে ওই বাসায় অভিযান চালানো হয়। ভিকটিমকে বাসায় খুঁজে না পেয়ে মনে হয় তারা ছাদের দিকে ওঠে। ওপরের দিকে ওঠার পরে বাকিটা এখন আল্লাহ জানে। ওদের দাবি, মনোয়ার ছাদ থেকে লাফ দিছে। তখন একটা আওয়াজ হওয়ার পরে তারা নিচে যায়। নিচে গিয়ে দেখে যে লোকটা গুরুতর আহত। পরে ওদের পরিবারের লোকজন নিয়ে যায় হাসপাতালে। আর ওই টিম আমাদের থানায় না এসে চলে গেছে।"
এদিকে পীরগাছা থানার উপপরিদর্শক কনক মনোরঞ্জন বর্মনকে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম মালিক জানান, পীরগাছা থানায় দায়ের করা একটি নিখোঁজ জিডির পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে অবস্থান শনাক্ত করে বিপিএটিসি এলাকায় অভিযানে যায় পীরগাছা থানা-পুলিশের একটি দল। সেখানে সাভার থানা-পুলিশের সহযোগিতায় তারা অভিযানে অংশ নেয়।
ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তে ঢাকা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে।