সকাল ৮টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের টাওয়ারে কিছু বিরল ও দুর্লভ পাখির ছবি তুলে ডরমিটরিতে ফিরি। বিকেলে আরেক পাক টাওয়ারে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল, তাই দুপুরের খাবারের পর সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তবে গাইড প্রসেনজিৎ দেববর্মা এবং পক্ষী আলোকচিত্রী ডা. শাহেনশাহ বাপ্পির তাড়ায় ভাতঘুম আর সম্ভব হলো না।

ডরমিটরি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের ঘন টিলাময় জঙ্গলের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ছোট্ট একটি পুকুরের পাড়ে থামি। গহিন বনের ভেতরেই এই ছোট্ট পুকুরটি—প্রয়াত ফরেস্ট রেঞ্জার মুনির আহমেদ ভাই আগে থেকেই বলেছিলেন। শীতে যখন বনে পানির উৎস কমে যায়, তখন পাখি ও অন্যান্য প্রাণীরা যেন তৃষ্ণায় কষ্ট না পায়, সে কারণেই বন বিভাগ এই ব্যবস্থা করেছে। পুকুরের পাড়ে দাঁড়াতেই শ্বেতশুভ্র পাহাড়ি দুধরাজের দেখা পাই। পরের দেড় ঘণ্টায় আরও ১১টি পাখির দেখা মেলে, যার মধ্যে দুই প্রজাতির নতুন পাখিও ছিল।

আলো কমতে থাকলে পাখিদের আনাগোনা বাড়ে। পরবর্তী ৩৭ মিনিটে সাতটি পাখির দেখা পাই। এর মধ্যে পাঁচটিই আমার জন্য নতুন ছিল; বিরল ও দুর্লভ তো বটেই। এত অল্প সময়ে সাতটি নতুন পাখির ছবি তোলা আমার কাছে ছিল সত্যিই ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। তবে এই ৭টি পাখির মধ্যেই বেলা ৩টা ৬ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে এক চমৎকার স্বরে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে আসে তুষারের মতো শ্বেতশুভ্র ও চওড়া ভ্রু—নীল-কমলা পাখিটি; কথাটি আমি ভুলতে পারব না।

ঝোপ থেকে বেরিয়েই পাখিটি পানিতে নামেনি। হয়তো আমাদের উপস্থিতিতে ভয় পাচ্ছিল। আমরা নীরবভাবে, মূর্তির মতো স্থির থাকায় একসময় সাহস বাড়ে এবং পাখিটি কাছাকাছি এসে পানিতে নামে। ধীরে-সুস্থে মনপ্রাণ ভরে গোসল করে যেন সারা দিনের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে পবিত্র করে তুলল—যেভাবে সে আচরণ করছিল, তা আমাকে মুগ্ধ করে। যদিও পুকুরটিকে সবাই ছোট পুকুর হিসেবেই চেনে, সেদিন থেকে আমি এর নাম রাখি পুণ্যি পুকুর। ৬ মার্চ ২০১৮ সালের ঘটনাটি এটি। সেদিনের নীল-কমলা পাখিটি ছিল পুরুষ। স্ত্রী পাখিটির দেখা পেতে একই বছরের ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

শ্বেতশুভ্র ও চওড়া ভ্রুর নীল-কমলা পাখিটি এ দেশের বিরল পরিযায়ী তুষার–ভ্রু চটক। ইংরেজি নাম স্নোয়ি-ব্রাউড ফ্লাইক্যাচার। Muscicapidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ficedula hyperythra। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটিকে দেখা যায়।

তুষার–ভ্রু চটক দৈর্ঘ্যে মাত্র ১১ সেন্টিমিটার ও ওজনে ৯ গ্রাম। পুরুষ ও স্ত্রী দেখতে পুরোপুরি আলাদা। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দেহের ওপরটা ধূসরে-নীল ও নিচটা লালচে-কমলা। ভ্রুরেখা প্রশস্ত ও তুষারের মতো সাদা। ডানা লালচে-বাদামি, বগল কালচে, থুতনি কালো, গলা ও বুক লালচে-কমলা, লেজ নীল ও লেজের গোড়া সাদা। অন্যদিকে স্ত্রীর দেহের ওপরটা জলপাই-বাদামি। গলা-বুক ঘিয়ে-সাদা ও দেহের নিচের বাকিটা ময়লা ঘিয়ে-কমলা। ভ্রুরেখা ও চোখের চারদিক কমলা-পীতাভ। ডানায় সামান্য লালচে টান থাকে। স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে চোখ বাদামি ও ঠোঁট কালো। পা, পায়ের পাতা ও নখ নীলচে-কালো ও ধূসর। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের ওপরটায় কালচে-বাদামির ওপর হলদে ছোপ ছোপ। বুক-পেট কমলাটে, যা বাদামি আঁশ-ছোপে ঢাকা।

শীতে এদের সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের মিশ্র চিরসবুজ বনে দেখা যায়। কদাচ ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের পাতাঝরা বনেও দেখা মেলে। আর্দ্র ঘন জঙ্গলের নিচু ঝোপঝাড় ও বাঁশবনে বিচরণ করে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় থাকে। ঘন ঝোপঝাড় ও স্যাঁতসেঁতে লতা-গুল্ম ও উপড়ে পড়া গাছের ডালপালার মাঝে কীটপতঙ্গ, কেঁচো ও ছোট ফল খুঁজে খায়। ‘ট্সিট-সিট্-সি-সিট্—’ বা ‘সিইই...সিইই...সি-সি...ইইই...সিট্’ স্বরে চমৎকারভাবে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় মূল আবাস এলাকার পাহাড়ের ঢালে পাথরের মধ্যে কিংবা গাছের গোড়ায়, মাটিতে বা শিকড়-বাকড়ের মধ্যে কাপের মতো ছোট্ট বাসা বানায়। ফিকে ধূসরাভ বা বাদামি-সাদার ওপর লালচে-বাদামি ঘন ছিটছোপযুক্ত তিন-চারটি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটতে কত দিন লাগে, তা জানা যায়নি। তবে স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানা লালন-পালন করে। আয়ুষ্কাল সচরাচর ২-৩ বছর, তবে ৮-৯ বছর পর্যন্ত বাঁচার রেকর্ড রয়েছে।

আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়