জয়পুরহাট জেলা আদালত চত্বরেই প্রতিদিন সকাল থেকে জমে ওঠে কর্মব্যস্ততা। আইনজীবীদের হাতে নথি, বিচারপ্রার্থীদের চোখে উৎকণ্ঠা—সব মিলিয়ে চলে বিচার-সংক্রান্ত নানা কাজ। এই ব্যস্ততার মধ্যেই আইনজীবী ভবনের নিচতলায় একটি ফটোকপি ও স্টেশনারি দোকানে চলছে নিয়মিত কার্যক্রম। দোকানটির তিন কর্মী দ্রুততার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করেন, ফলে গ্রাহকদের মধ্যে আগ্রহও বেশি দেখা যায়। কর্মীদের মধ্যে তিনজনই সহোদর এবং জন্ম থেকেই বাক্‌প্রতিবন্ধী।

বাবার সহযোগিতায় স্বাবলম্বী পথে

তিন ভাইয়ের নাম—সাকিব ইসলাম (২৬), যমজ ইমাম সাফি সিফাত (২৪) ও শাইখ শারফুদ্দিন শিপন (২৪)। কথা বলতে না পারলেও হাতের ইশারা, চোখের ভাষা, কাগজে লেখা কয়েকটি শব্দ আর এক টুকরো হাসিই তাদের যোগাযোগের মাধ্যম। নীরবতাকেই তারা শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যাচ্ছেন।

তাদের বাবা সামছুল ইসলাম জয়পুরহাট জজ আদালতের আইনজীবী। তিন সন্তান জন্ম থেকেই বাক্‌প্রতিবন্ধী হলেও শুরুতে উদ্বেগ থাকলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে হাল ছাড়েননি বাবা-মা।

সাকিব উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। যমজ দুই ভাই মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে আদালত চত্বরে ‘তিন ভাই ফটোস্ট্যাট’ নামে একটি ফটোকপি ও স্টেশনারি দোকান করে দেন বাবা। তখন থেকে তিন ভাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফটোকপি, প্রিন্ট, কোর্ট ফি, টিকিট ও স্টেশনারি সামগ্রীর দোকান পরিচালনা করে আসছেন।

সন্তানদের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়েই আদালত চত্বরে দোকানটি করা হয় বলে জানিয়েছেন বাবা সামছুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘তিন সন্তানই জন্মগতভাবে বাক্‌প্রতিবন্ধী। তাই বলে কখনো তাদের অবহেলা করিনি। লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছি। এখন ওরাই নিজেরা ব্যবসা পরিচালনা করছে। বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না।’

বড় ভাই সাকিব ইসলাম একটি কাগজে লিখে জানান, ‘পরিবার কখনো আমাদের বোঝা মনে করেনি। বরং সব সময় পাশে থেকেছে, সাহস ও সমর্থন দিয়েছে। নিজেদের পরিশ্রমে আমরা চলতে পারি—এটাই সবচেয়ে ভালো লাগে। মানুষের সহযোগিতা ও ভালোবাসায় আরও এগিয়ে যেতে চাই।’

ইশারাই হয়ে উঠেছে যোগাযোগের ভাষা

দোকানের ভেতরে কাজের সমন্বয় বেশ লক্ষ্যণীয়। একজন গ্রাহকের কাছ থেকে নথি নেন, অন্যজন ফটোকপি বা প্রিন্ট করেন, তৃতীয়জন কাগজপত্র গুছিয়ে দেন। প্রয়োজন হলে কাগজে লিখে বা মুঠোফোনের ক্যালকুলেটরে মূল্য দেখিয়ে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্থানীয়ভাবে নিয়মিত গ্রাহকেরাও তাদের নীরব যোগাযোগ বুঝে নিয়েছেন। ফলে দৈনন্দিন কাজে কোনো জটিলতা তৈরি হয় না।

তিন ভাইয়ের দোকানে প্রায়ই অন্য দোকানের তুলনায় বেশি ভিড় থাকে বলে জানান পাশের দোকানি কাওসার হোসাইন। তিনি বলেন, তাঁরা খুব দ্রুত ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেন। তাঁদের ওপর সবার আস্থা আছে।

নথি ফটোকপি করতে আসা গ্রাহক ইমরান হোসেনের ভাষ্য, ‘প্রথমে বুঝতেই পারিনি দোকানের তিনজনই বাক্‌প্রতিবন্ধী। পরে জেনে অবাক হয়েছি। কিন্তু আমার কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। তাঁরা খুব দক্ষতার সঙ্গে সেবা দেন।’

নীরবতার মধ্যেও থেমে নেই জীবন

তিন ভাইয়ের জীবনসংগ্রাম অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা বলেও উল্লেখ করেছেন জয়পুরহাট আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) শাহনূর রহমান শাহিন। তিনি বলেন, প্রায় ৯ বছর ধরে আদালত চত্বরে ব্যবসা করছেন তাঁরা। বাক্‌প্রতিবন্ধী হলেও কর্মদক্ষতা, সততা ও আন্তরিকতার কারণে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের আস্থা অর্জন করেছেন বলে জানান তিনি।

আদালত চত্বরে তখনও মানুষের ভিড়। এক গ্রাহক নথি এগিয়ে দিলে তিন ভাইয়ের একজন তা গ্রহণ করেন। কোনো শব্দ উচ্চারিত না হলেও থামে না কাজ। প্রতিদিনের নীরব পরিশ্রমই হয়ে উঠছে আত্মনির্ভরতার এক ভিন্নধর্মী গল্প।