ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজে এমপিওভুক্ত (বেতন-ভাতার সরকারি অংশ) না হয়েও দীর্ঘদিন ধরে পাঠদান করছেন ১০ শিক্ষক। কলেজটিতে শিক্ষক আছেন ২৭ জন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জন বেতন-ভাতা পান। বাকি ১০ জন—যাদের মধ্যে আলফাজ উদ্দিনও রয়েছেন—১১ থেকে ১৫ বছর ধরে বিনা বেতনে ক্লাস নিচ্ছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অনুমোদন থাকলেও এমপিওভুক্তিতে দেরির কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে শিক্ষক ও কলেজের ডিগ্রি শাখার ভবিষ্যৎ ঘিরে।
আলফাজ উদ্দিন কলেজের একজন প্রভাষক। তাঁর সংসার চলে কৃষিকাজ ও সবজি বিক্রির আয়ে। তিনি নাসিরনগরের চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি (পাস) এবং সার্টিফিকেট কোর্সে প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন। মা–বাবা, দুই ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে তাঁর পরিবার। এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এক দশকের বেশি সময় ধরে কলেজে পাঠদান করলেও তিনি কোনো বেতন-ভাতা পাননি।
২০১৬ সালে এমপিওভুক্তির আশায় কলেজে যোগ দেন আলফাজ উদ্দিন। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও বাস্তবায়ন হয়নি বলে তিনি জানান। মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কলেজে যোগদানের পর থেকে এক টাকাও বেতন পাইনি। নিজেদের জমি নেই। বর্গা নেওয়া ২০ শতক জমিতে কৃষিকাজ করেই সংসার চালাই। প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। সেই টাকা জোগাড় করতে বাবা-ছেলে দুজনকেই মাঠে ও বাজারে কাজ করতে হয়।’ তাঁর আক্ষেপ, ‘অনেকে আমাকে অবহেলার চোখে দেখেন। যখন কেউ গ্রামের কোনো অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে আসেন, সেটি আমার কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। দাওয়াতে যেতে পারি না। কারণ, সংসারের খরচ জোগাতেই তো হিমশিম খেতে হয়।’
একই কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিভাগের শিক্ষক আবদুর রশিদ ২০১৪ সালে কলেজে যোগ দেন। এক যুগ ধরে তিনিও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের ডিঘর গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রশিদের সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি বলেন, স্ত্রীর একার আয়ে সংসার চলে না; ফলে জমিজমা বিক্রির পথও নিতে হয়েছে। বর্তমানে সবজি চাষের পাশাপাশি টিউশনি করেন। কলেজে যাতায়াতেই তাঁর প্রতিদিনকার খরচ হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।
মেঘনা নদীঘেঁষা চাতলপাড় ইউনিয়নে ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চাতলপাড় ডিগ্রি কলেজ। স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই বছর নাসিরনগর সফরে এসে কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা দেন। স্থানীয় ব্যক্তিদের দান করা প্রায় তিন একর জমির ওপর গড়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটি।
কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১১ সালে কলেজে বিএ (পাস) ও ২০১৫ সালে বিএসএস (পাস) কোর্স চালু হয়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি মিলিয়ে প্রায় ৫৫০ শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছেন। ডিগ্রি শাখায় রয়েছেন প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী। নাসিরনগর উপজেলা সদর থেকে কলেজটির দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার—এর মধ্যে ১৪ কিলোমিটার নৌপথ, বাকি অংশ কাঁচা সড়ক। বর্ষাকালে কলেজে পৌঁছাতে সময় লাগে দু–তিন ঘণ্টা।
কলেজের অধ্যক্ষ মো. ওমর আলী বলেন, ডিগ্রি শাখা চালুর পর থেকে তিনবার এমপিওভুক্তির আবেদন করা হয়েছে, তবে এখনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তিনি জানান, ‘কলেজের আয় খুবই সীমিত। কোনো রকমে পরিচালন ব্যয় মেটানো হয়। তাই শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। তবে এমপিওভুক্তির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
কলেজ সূত্র জানায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে সন্তোষজনক ফল করছে। তারপরও এমপিওভুক্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষকদের ত্যাগ ও পরিশ্রমের আর্থিক স্বীকৃতি মিলছে না। এই বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের শরণাপন্ন হয়। তাঁর মাধ্যমে কলেজের ডিগ্রি (পাস) কোর্সটি এমপিওভুক্ত করার দাবিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীসহ দপ্তরে আধা সরকারিপত্র দেওয়া হয়েছে।
বছরের পর বছর বেতন ছাড়াই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করে যাচ্ছেন এই শিক্ষকেরা। তাঁদের প্রত্যাশা, একদিন কলেজের ডিগ্রি শাখা এমপিওভুক্ত হবে এবং তখন শিক্ষকতার পেশাটিই হবে তাঁদের পরিবারের প্রধান অবলম্বন।