ভারতের মাটিতে বসে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার নিয়ে কথা বলা এবং ভারত সরকারের সেই সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত কেমন সম্পর্ক চায়, সেই সিদ্ধান্ত এখন ভারতকেই নিতে হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

বৃহস্পতিবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে গতকাল দিল্লিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ভারতে অবস্থানরত সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বাংলাদেশকে ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে শামা ওবায়েদ বলেন, গতকাল রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে কূটনৈতিক ভাষায় যতটুকু সম্ভব সরকার তা ব্যক্ত করেছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ এর আগেও ভারতকে বারবার বলেছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে তারা ঠিক কেমন সম্পর্ক চায়, সে বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। এই জঙ্গিবাদের তত্ত্বকে আওয়ামী লীগের ‘পুরোনো নোংরা রাজনীতি’ হিসেবে অভিহিত করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “এটাই তারা এখন বিদেশের মাটিতে বসে আবার নতুন করে করার চেষ্টা করছে। এখন এটি চলতে দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত ভারত সরকারকেই নিতে হবে।”

শেখ হাসিনার শাসনামলের প্রসঙ্গ টেনে শামা ওবায়েদ বলেন, ১৭ বছরের শাসনামলে যখনই কোনো ঘটনা ঘটেছে, তখনই উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের একটি বয়ান তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ একই সময়ে তাদের নিজেদের হাতে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের সরকার ও জনগণই সম্পর্ক উন্নত করতে চায়। তবে স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী ও সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতা এবং দলের প্রধান যদি ভারতের মাটিতে বসে এ ধরনের ‘ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্ম’ চালিয়ে যান এবং ভারত সরকার তা বন্ধ না করে, তবে তা বাংলাদেশের জনগণের জন্য উদ্বেগের কারণ হবে।

দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ইস্যু সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমরা বসতে চাই, আলোচনা করতে চাই। কিন্তু সিদ্ধান্তটা এখন ভারতকে নিতে হবে।’

ভারতের হাইকমিশনারের সাথে বিদ্যুৎমন্ত্রীর সাক্ষাৎ এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত রাখার আহ্বানের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটাই প্রমাণ করে যে দুই দেশের সরকারের সম্পর্ক বহুমুখী। খুনি হাসিনা বা তার দোসররা তো চাইবেই যে আমরা ওই জায়গায় আটকে থাকি। কিন্তু বাংলাদেশ তো একটা জায়গায় আটকে থাকতে পারে না। জ্বালানি সহযোগিতা, পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা—এসব ইস্যুতে আলোচনা চলবে।’

তবে সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যের বিষয়টি নিছক ‘২৪-৩৬ ঘণ্টার ব্যাপার নয়’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি জুলাই যোদ্ধা, তাদের পরিবার এবং বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের সেন্টিমেন্টকে সরাসরি আঘাত করে। এ বিষয়ে ভারতকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে এবং ভবিষ্যতে কী করতে চায়, সে বিষয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

দিল্লিতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং উচ্চপর্যায়ের সফরের মতো সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে কি না, সে বিষয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে, সেই সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে। আমরা চাই ভালো সম্পর্ক থাকুক। তবে সেটা জনগণের স্বার্থে, সমতার ভিত্তিতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা-সম্মানের জায়গায় রেখে এবং নিজেদের স্বার্থ বজায় রেখে হতে হবে।’

অন্যদিকে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাড়া দেবেন কি না, সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় বহুপক্ষীয় ফোরামে অংশগ্রহণে আগ্রহী। তবে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়া তাঁর ব্যস্ততা ও সময়সূচির ওপর নির্ভর করবে। ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিমসটেক প্রধান হিসেবে পৃথক দুটি আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ এরই মধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন প্রতিমন্ত্রী।