একটি মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মর্যাদা স্থির হয় তার প্রকাশিত গবেষণার নির্ভরযোগ্যতা ও গুণগত মানে—সংখ্যায় নয়। গবেষণার পরিমাণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়ে বেশি বিবেচ্য হলো, ওই গবেষণা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে কি না। কারণ, নতুন গবেষণা সাধারণত আগের কাজের ভিত্তির ওপরই দাঁড়ায়।
তাই ত্রুটিপূর্ণ বা অসৎ গবেষণাপত্র কেবল একজন গবেষকের জন্যই ব্যর্থতা নয়; নীরবে তা গোটা জ্ঞানের ভাণ্ডারকেই দুর্বল করে। এ কারণে গবেষণায় সততা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং গবেষণার মৌলিক শর্ত। একই সঙ্গে এটি গবেষকের চরিত্র ও পেশাগত দায়বদ্ধতার পরিচয়ও দেয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একের পর এক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহারের ঘটনা জাতীয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, তথ্যের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তি কিংবা অর্থের বিনিময়ে গবেষণাপত্র তৈরির অভিযোগ—এসব কেবল সংশ্লিষ্ট গবেষকের নয়; গোটা দেশের গবেষণা-অঙ্গনের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এ প্রশ্নটি নিছক নৈতিকতার নয়, একই সঙ্গে প্রতিযোগিতারও। বিশ্বজুড়ে একজন গবেষকের মান মূল্যায়িত হয় তাঁর কাজ কতবার উদ্ধৃত হয়েছে, সেটির ভিত্তিতে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ের একটি বড় অংশ নির্ভর করে গবেষণা ও সাইটেশনের সংখ্যার ওপর। একটি প্রত্যাহৃত গবেষণাপত্র উদ্ধৃতি-প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, গবেষকের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনামেও আঘাত হানে। চৌর্যবৃত্তি বা অনিয়মে ভরা প্রকাশনা দীর্ঘমেয়াদে র্যাঙ্কিং বাড়িয়ে দেয় না; বরং উল্টো কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। অর্থাৎ গবেষণায় সততা ও বৈশ্বিক অবস্থান একই সূত্রে গাঁথা।
আমার বিশ্বাস, গবেষণায় অনিয়ম রোধের কার্যকর উপায় শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়; দরকার এমন একটি কাঠামোগত পরিবেশ, যেখানে অনিয়মের সুযোগ কমে আসে। সেই ভাবনা থেকেই কিছু করণীয় উঠে আসে, যা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
গবেষণায় সততা রক্ষা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি গোটা উচ্চশিক্ষা খাতের যৌথ দায়। বাংলাদেশের গবেষকদের মেধা নিয়ে আমার সংশয় নেই। প্রয়োজন কেবল এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সততা সুবিধার বিষয় নয়, স্বাভাবিক অভ্যাস। সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষণা কেবল সংখ্যায় নয়, মর্যাদা ও র্যাঙ্কিংয়েও এগিয়ে যাবে।
প্রথমত, প্রয়োজন সচেতনতা। শিক্ষক যদি প্রকাশনার নৈতিক মানদণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না রাখেন, তবে অনিচ্ছাকৃত ভুলও হতে পারে। তাই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত নিয়মিতভাবে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গবেষণা-নৈতিকতাবিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করা—যেন প্রকাশনার নৈতিকতা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণা-সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ত, সচেতনতা একা যথেষ্ট নয়; দরকার কাঠামোবদ্ধ যাচাই-ব্যবস্থা। বহু বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা প্রকাশনায় সহায়তা দেয়—যেমন সম্মেলনে অংশগ্রহণ বা আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের প্রকাশনা ফি বাবদ। তবে এই সহায়তা যেন স্বয়ংক্রিয় না হয়। প্রতিটি আবেদনকে একাধিক স্তরের যাচাই পেরিয়ে তবেই অনুমোদনের পথে যেতে হবে।
একটি আদর্শ প্রক্রিয়ায় আবেদন শুরুতে বিভাগীয় প্রধান ও সংশ্লিষ্ট ডিনের কাছে যাচাই হবে। এরপর তা যাবে স্কুল বা অনুষদ পর্যায়ের একটি গবেষণা কমিটির কাছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ বিশেষজ্ঞরা গবেষণাটি খতিয়ে দেখবেন। সবশেষে চূড়ান্ত পর্যালোচনার পরই অর্থ ছাড়ের সুপারিশ আসবে। ধাপে ধাপে একাধিক দৃষ্টিতে একই গবেষণা পর্যালোচিত হলে ত্রুটি লুকিয়ে থাকার সুযোগও কমে যায়।
অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের পরে বা কোনো জার্নালের ‘পিয়ার-রিভিউ’-এর পরও ভুল তথ্য দেওয়া থেকে শুরু করে চৌর্যবৃত্তিসহ সব ধরনের অভিযোগে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হচ্ছে। ফলে শেষ পর্যন্ত একটি গবেষণার মৌলিকত্ব নির্ভর করে লেখকের সততার ওপর, আর পুরো দায়দায়িত্ব লেখকেরই।
এ কারণেই চৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে দৃঢ় নীতিমালা থাকা জরুরি। প্রতিটি গবেষণাপত্র জমা বা প্রকাশের আগে বাধ্যতামূলকভাবে সাদৃশ্য যাচাই ও চৌর্যবৃত্তি পরীক্ষার ভেতর দিয়ে গেলে বহু অনিয়ম উৎসেই থেমে যেতে পারে। তবে নীতিমালার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন স্পষ্টভাবে জানায় যে চৌর্যবৃত্তি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং সেই অবস্থান কার্যকরভাবে মানতে পারে—তখন তা গবেষকদের মধ্যে সততার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
জাতীয় পর্যায়েও কিছু বিষয় এখন জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রয়োগযোগ্য প্রকাশনা-নৈতিকতা নীতিমালা থাকা দরকার। সাম্প্রতিক আলোচনায় দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রতিষ্ঠিত নীতিমালাই নেই। এই শূন্যতা পূরণ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, প্রণোদনা যেন সংখ্যাভিত্তিক না হয়ে মানভিত্তিক হয়; ‘কত বেশি প্রকাশনা’ যখন ‘কত ভালো প্রকাশনাকে’ ছাপিয়ে যায়, তখনই অনিয়মের প্রলোভন তৈরি হয়। তৃতীয়ত, কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকসের (কোপ) মতো আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে নিজেদের প্রক্রিয়া গড়ে তোলা উচিত।
গবেষণায় সততা রক্ষা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি গোটা উচ্চশিক্ষা খাতের যৌথ দায়। বাংলাদেশের গবেষকদের মেধা নিয়ে আমার সংশয় নেই। প্রয়োজন কেবল এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সততা সুবিধার বিষয় নয়, স্বাভাবিক অভ্যাস। সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গবেষণা কেবল সংখ্যায় নয়, মর্যাদা ও র্যাঙ্কিংয়েও এগিয়ে যাবে।
● ম. তামিম উপাচার্য, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)