পরীক্ষা খারাপ হয়েছে—ভাবটা আর সামলাতে পারছেন না? চলুন, একটা পাস্তা খেয়ে আসি। বন্ধুর সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছে—এক স্কুপ আইসক্রিম হয়তো অল্প সময়ের জন্য মন ভালো করে দেবে। আবার কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই বার্গার, পিৎজা বা ওয়াফল খেতে ইচ্ছা হয় অনেকেরই। শুধু ক্ষুধা নিবারণ নয়, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে খাবারের দিকে ঝুঁেড় পড়ার প্রবণতার নাম ‘ইমোশনাল ইটিং’। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, জেন–জির মধ্যে এ অভ্যাস আগের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—এ আচরণ কি সত্যিই মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক, নাকি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে?
আযান, দশম শ্রেণির একজন ছাত্র। পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাস টেস্ট তেমন ভালো হয়নি। স্কুল ছুটির পর পাশের একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে সে ওভেন বেকড পাস্তা অর্ডার দেয়। পাস্তার প্লেট খালি হতেই তার মনে হয়, পরীক্ষা খারাপ হওয়ার হতাশাটা অনেকটাই কমে গেছে। এরপর সে বাসায় ফিরে পরের দিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে।
আযান একা নয়। এসএসসি পরীক্ষা শেষে দীর্ঘ ছুটিতে নুহা বন্ধুদের নিয়ে বেইলি রোডে যায়; খাওয়াদাওয়া, আড্ডা আর ছবি তোলার জন্য। অন্যদিকে রাইয়ান এক সপ্তাহের ছুটির একঘেয়েমি কাটাতে ঢুকে পড়ে একটি রেস্তোরাঁয় এবং ওয়াফল অর্ডার দেয়। খাবার শেষ হতে না হতেই তার বিরক্তিটাও কিছুটা উধাও হয়ে যায়।
এ ধরনের উদাহরণ এখন চারপাশে। কেবল জেন–জিই নয়, বিভিন্ন বয়সের মানুষই কখনো কখনো মন ভালো করতে খাবারের আশ্রয় নেয়। তবে তরুণদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের পুষ্টিবিদদের মতে, ইমোশনাল ইটিং হলো এমন এক খাদ্যাভ্যাস, যেখানে মানুষ শারীরিক ক্ষুধার কারণে নয়, বরং নিজের আবেগ বা অনুভূতির প্রতিক্রিয়ায় খাবার খায়। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব, হতাশা কিংবা আনন্দ—যেকোনো তীব্র আবেগই এর কারণ হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের মনোবিজ্ঞানী ডা. সুসান অ্যালবার্সের মতে, মানুষের খাদ্যাভ্যাসের প্রায় ৭৫ শতাংশের পেছনেই কোনো না কোনোভাবে আবেগের প্রভাব থাকে।
ফলে ধারণা করা হচ্ছে, জেন-জির মধ্যে কারও কারও ক্ষেত্রে বয়সের গতি ত্বরান্বিত হওয়ার মতো বাস্তবতাও তৈরি হতে পারে। তবে এই প্রবণতা শুধু পশ্চিমা দেশেই নয়, বাংলাদেশেও দেখা যাচ্ছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের শিক্ষার্থী লুতফা আক্তার ও তাহিরা আক্তার শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া জেন–জির খাদ্য নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বৈশ্বিক খাদ্যসংস্কৃতি, বন্ধুদের প্রভাব এবং মানসিক তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইমা সালেহীন বলেন, রাতে ভাত খেতে তাঁর ভালো লাগে না। তাই প্রায়ই বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করেন। আবার পরীক্ষার চাপ বা অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন ঘনিয়ে এলেও তাঁর খাবারের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইমোশনাল ইটিংয়ের একটি পরিচিত উদাহরণ। সাময়িকভাবে খাবার মন ভালো করতে পারে, কিন্তু যে চাপ বা দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য খাওয়া হয়েছিল, সেটি পরে আবার ফিরে আসে।
জেন–জির কাছে রেস্তোরাঁ এখন কেবল খাওয়ার জায়গা নয়। আড্ডা, ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চেক–ইন দেওয়া এবং মানসিক চাপ কিছুটা ভুলে থাকার জায়গাও হয়ে উঠছে অনেক ক্ষেত্রে। সেই কারণে কোনো রেস্তোরাঁ তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় হবে কি না—তা খাবারের স্বাদের পাশাপাশি কতটা ‘ফটোজেনিক’, সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনার চাপ, অ্যাসাইনমেন্ট, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা একঘেয়েমির মধ্যেও ভালো খাবার সাময়িক স্বস্তির উপায় হয়ে ওঠে বলে মনে করেন অনেকে। সঙ্গে যদি ভালো ছবি তোলা যায়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতাকে আরও পূর্ণ বলে মনে হয়।
তবে মন খারাপের দিনেও প্রিয় খাবার খাওয়া দোষের নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সমস্যা দেখা দিতে পারে তখনই, যখন দুশ্চিন্তা, একাকিত্ব, হতাশা কিংবা মানসিক চাপ—এসবের প্রতিবারই একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে খাবার। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে ফাস্টফুড, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত বা চিনি বেশি থাকা খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
রাজধানীর বারিধারার ফরাজি হাসপাতাল ও স্পেড বিডির পুষ্টিবিদ নাহিদা আহমেদ বলেন, ‘নিয়মিত ফাস্টফুড খাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার মধ্যে আছে মারাত্মক স্থূলতা বা ওবেসিটি, টাইপ–২ ডায়াবেটিস, অল্প বয়সেই হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি। এ ছাড়া শরীরের পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে হাড়ের দুর্বলতা, লিভারের ক্ষতি এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’
তাঁর পরামর্শ, ঘরে তৈরি খাবারকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। পাশাপাশি আম, জাম, পেয়ারা, কলা, পেঁপের মতো মৌসুমি ফল এবং বিভিন্ন ধরনের বাদামও নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা ভালো।
মাঝেমধ্যে প্রিয় কোনো খাবার খেয়ে মন ভালো করতেই পারেন। কিন্তু প্রতিবারই আবেগ সামলানোর ভাষা হয়ে ওঠে খাবার—এ অবস্থাই শরীর ও মনের জন্য এক ধরনের সতর্কবার্তা হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সময়ে নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি কার্যকর।