আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী সোমেশ্বরী ও মহাদেও নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের তৎপরতা থামছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে দিনের পর দিন এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। নদী থেকে বালু তুলে প্রকাশ্যে মহাসড়কের পাশে মজুত ও বিক্রি করা হলেও দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

তদন্ত করে দেখা গেছে, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, পূর্বধলা, সদর ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন নদীঘাটে প্রতিদিন শত শত ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত এসব বালু ইজিবাইক, ছোট ট্রাক ও ভ্যানে করে মহাসড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে এবং সেখান থেকেই সরবরাহ করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বালু ব্যবসায়ী দাবি করেছেন, প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ না করে এই ব্যবসা চালানো অসম্ভব। তাদের দাবি, নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার কারণেই তারা নির্বিঘ্নে বালু পরিবহন ও বিক্রি করতে পারছেন। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নদী রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে বছরের পর বছর এই তৎপরতা চলছে। এর ফলে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভাঙন বৃদ্ধি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসছে।

ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদী একসময় দেশের অন্যতম সুন্দর সীমান্ত নদী ছিল। এর স্বচ্ছ পানি ও রূপ দেখতে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক দুর্গাপুরে ভিড় জমাতেন। কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় আগে নদীর প্রায় দুই হাজার একরজুড়ে পাঁচটি বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পর চিত্র বদলে যায়। ইজারার আড়ালে শত শত ড্রেজার বসিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বালু, নুড়িপাথর ও কয়লা তোলায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ ধ্বংসের মুখে পড়ে।

পরবর্তীকালে পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সোমেশ্বরী নদী থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ইজারা বন্ধ হলেও বাস্তবে আদালতের আদেশের কোনো প্রতিফলন নেই বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সোমেশ্বরী নদী থেকে উত্তোলিত বালু বস্তাবন্দি করে ইজিবাইকে পূর্বধলা উপজেলার জামধলা, জারিয়া, গোজালীকান্দা, দেওডুকোনসহ অন্তত ৩৮টি পয়েন্টে মহাসড়কের পাশে মজুত করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি ঘনফুট বালু ৯০ থেকে ৯৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে, অথচ বৈধ ইজারা চালু থাকাকালে এর দাম ছিল ২৫ থেকে ৪০ টাকা।

একই চিত্র কলমাকান্দার মহাদেও নদীতেও। সেখানে প্রতিদিন প্রায় অর্ধশত নৌকায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উপজেলা শহরের বুক চিরে, এমনকি থানা ভবনের অদূর দিয়েই বালুবাহী গাড়ি চলাচল করলেও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া নেত্রকোনা সদরের দামড়িখোলা ও বোবাহালা এবং পূর্বধলা ও বারহাট্টা উপজেলার কংস নদীতেও অবাধে চলছে বালু লোপাট।

পরিবেশবিদদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বালু তোলায় নদীর তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে পাড় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে এবং জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সোমেশ্বরী, মহাদেও ও কংস নদী চিরতরে অস্তিত্ব হারাতে পারে।

এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ সাদাত এবং পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শফিকুল ইসলাম বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে এই বিষয়ে বক্তব্যের জন্য নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।