বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই মাস ছিল এক অনন্য সন্ধিক্ষণ। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শুরু করা আন্দোলন খুব দ্রুতই দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় সরকারের পতন। তবে ইতিহাসের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া একটি আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের দাবিতে কেন পরিণত হলো?

এই প্রশ্নের উত্তর কেবল কোটা সংস্কার ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোটা ছিল একটি তাৎক্ষণিক উদ্দীপক, কিন্তু এর গভীরে ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অসন্তোষ। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি উভয়ই চরম চাপের মুখে ছিল। দুই অঙ্কের মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকোচন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার পাশাপাশি জনসেবার চরম অবনতি মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ অনুভব করছিল যে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে তারা ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ফলে কোটা আন্দোলন ধীরে ধীরে রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও বৈধতার প্রশ্নে রূপ নেয়।

জুলাইয়ের এই আন্দোলন কেবল একটি সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং এটি ছিল এমন এক উন্নয়ন মডেলের বিরুদ্ধে যেখানে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর পুনর্গঠন করে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি প্রতিষ্ঠা করা।

"বৈষম্য হ্রাসও হতে হবে উন্নয়নকৌশলের অন্যতম কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। জুলাই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায়সংগতভাবে বণ্টিত হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক বৈষম্য, মানসম্মত শিক্ষায় অসম প্রবেশাধিকার, নারীর কর্মসংস্থানে বৈষম্য, ডিজিটাল বিভাজন ও তরুণদের সীমিত সুযোগ—এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।"

দুই বছর পর এখন প্রশ্ন জাগে, সেই প্রত্যাশাগুলো কতটা পূরণ হয়েছে? ক্ষমতার পালাবদলের মাপকাঠিতে জুলাই একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জনসেবার উন্নতির বিচারে জুলাইয়ের বড় অংশের এজেন্ডা এখনো অসমাপ্ত। জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে পেরেছে কি না, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শান্তিপূর্ণ, অর্থনীতি উৎপাদনশীল, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত।

এই লক্ষ্য অর্জনে প্রথমত প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বৈধ পথ সংকুচিত হলে জনগণের অসন্তোষ রাস্তায় বিস্ফোরিত হয়, যা জুলাই আমাদের শিখিয়েছে। তাই অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। বিনিয়োগকারীরা এমন দেশ চান যেখানে নীতিগত ধারাবাহিকতা থাকে এবং সাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। এজন্য নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করা অপরিহার্য।

একই সঙ্গে ব্যক্তিনির্ভর শাসনব্যবস্থা থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর শাসনব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটাতে হবে। জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। কারণ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে কর্মসংস্থান। আগামী দিনের উন্নয়ন কৌশলকে আরও বহুমাত্রিক হতে হবে। শুধু উচ্চ প্রবৃদ্ধি নয়, বরং নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, রপ্তানির বহুমুখীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশের মাধ্যমে শিক্ষিত তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অর্থনীতির সংযোগ তৈরি করতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের জন্য এখন বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়, বরং একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং করপোরেট সুশাসনের সমস্যা সমাধান করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল করব্যবস্থার সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি ন্যায়সংগত করকাঠামো গড়তে হবে, যাতে নাগরিকরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা পান।

জ্বালানি নিরাপত্তাকেও অর্থনৈতিক কৌশলের ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। স্বল্প মেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ জরুরি। এছাড়া প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতা ও সম্পদ প্রদান করলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার মান উন্নত হবে এবং উন্নয়ন হবে আরও জবাবদিহিমূলক।

সবশেষে, এই সংস্কারগুলো হতে হবে তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক। কার্যকর জননীতি কেবল রাজনৈতিক বিবেচনার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; এর ভিত্তি হতে হবে গবেষণা ও নিয়মিত মূল্যায়ন। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ উন্নত হলে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। জুলাইয়ের প্রকৃত বার্তা ছিল রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা—যেখানে নাগরিক কেবল ভোটার নন, বরং উন্নয়নের অংশীদার এবং রাষ্ট্র হবে নাগরিকের অধিকার ও সম্ভাবনার রক্ষক।

— ড. ফাহমিদা খাতুন
অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)