আজ ৫ আগস্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ জুলাই। শেষ হল অভ্যুত্থানের ২ বছর। সারাদেশে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ বিদায় নিলেও লক্ষ্মীপুরে একদিন আগেই ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার জোর আন্দোলনে পালিয়ে যায় দলটির নেতাকর্মীরা। এইদিন যুবলীগ-ছাত্রলীগের গুলিবর্ষনসহ হামলা-পাল্টা হামলায় ৪ শিক্ষার্থীসহ ১২ জনের প্রাণহানি ঘটে। প্রত্যেকটি হত্যার ঘটনায় হয়েছে মামলা। ৪ শিক্ষার্থী হত্যা মামলায় আদালতে ৬২৫ জনের নামে চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ। তবে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারসহ দ্রুত বিচার না হওয়ায় আশাহত শহীদ পরিবার।

জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফিরে দেখা ২ আগস্ট-সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করতে সারাদেশের মতো লক্ষ্মীপুরেও শিক্ষার্থীরা চব্বিশের জুলাইজুড়ে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিল। এরমধ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশ- শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করে।

২ আগস্ট শহরের প্রাণ কেন্দ্র চকবাজারে মুসল্লী ও আন্দোলনে আসা ছাত্র-জনতার ওপর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু ছাতা ‘অ্যাকশন’ চালায়। এরপরও শিক্ষার্থীরা বৃষ্টিতে ভিজে মিছিল নিয়ে গোডাউন রোড এলাকা থেকে উত্তর তেমুহনীর দিকে যাচ্ছিল। পথে সাবেক মেয়র এমএ তাহেরের বাসায় অবস্থান নেওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে মিছিল থেকে ইট-পাটকেল ছোঁড়া হয়। তাৎক্ষণিক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয় এবং কয়েকজনকে মারধর করে। সেইদিন জেলা পুলিশ সতর্ক থাকা সত্ত্বেও ঘটনাটি ঘটেছে। একপর্যায়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ‘উপজেলা চেয়ারম্যান টিপুর উস্কানিতে অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে’। ওই ঘটনায় জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি টিপুর গাড়ি চালক ‘শর্টগান’ হাতে ধাওয়া করে শিক্ষার্থীদের। শর্টগানটিও ছিল টিপুর নামে লাইসেন্সকৃত।

ফিরে দেখা ৪ আগস্ট- একটি ভয়াবহ দিন ছিল চব্বিশের ৪ আগস্ট। এইদিন উত্তর তেমুহনীতে অবস্থান কর্মসূচি দেয় আওয়ামী লীগ এবং ঝুমুর এলাকায় কর্মসূচি দেয় ছাত্র-জনতা। কিন্তু শুরুতেই বাগবাড়িতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এরমধ্যে ঝুমুর এলাকায় অবস্থান নেয় ছাত্র-জনতা। সেখানে স্বৈরাচার বিরোধী আইনজীবীরাও তাদেরকে সমর্থন জানায়। হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করে, বোমা বিস্ফোরণ ও গুলি ছোঁড়ে। গুলিতে মাদাম ব্রিজে শিক্ষার্থী সাদ আল আফনান শহীদ হন।

একপর্যায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে কয়েক হাজার ছাত্র-জনতা। এতে পেছনে হটতে শুরু করে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ তাদের নেতাকর্মীরা। পরে তারা লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র এমএ তাহেরর তমিজ মার্কেট এলাকায় গিয়ে সশস্ত্র অবস্থান করে। এরমধ্যে মিছিল নিয়ে উত্তর তেমুহনী থেকে বাজার আসার পথেই তমিজ মার্কেটে যুবলীগ-ছাত্রলীগের হামলা শিকার হয় ছাত্র-জনতা। আর বাসার ছাদ থেকে তাহেরপুত্র সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাহ উদ্দিন টিপুসহ তার লোকজন গুলি ছোঁড়ে। প্রায় ৪ ঘন্টা গুলি ছোঁড়া হয় ছাত্র-জনতার ওপর। এতে তমিজ মার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাব্বির হোসেন, কাউছার হোসেন বিজয় ও ওসমান গণি শহীদ হন। তবে আশাহত হয়নি ছাত্র-জনতা। শক্ত প্রতিরোধে একপর্যায়ে পুরো এলাকা ছাত্র-জনতার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ঘটনাস্থল দেখা যায়নি।

এদিকে উত্তেজিত ছাত্র-জনতা মেয়র তাহেরর বাসভবনে আগুন লাগিয়ে দেয়। এর বিপরীত পাশে তাহেরপুত্র যুবলীগ নেতা টিপুর বাসভবনেও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। মেয়র তাহেরের আগুনে উত্তপ্ত বাসা থেকে বের হওয়া যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৮ জনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করে ছাত্র-জনতা। ওই ঘটনায় অসংখ্য ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধ হয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, অনেকেই চোখে দেখে না। সেইদিন মেয়র তাহেরের বাসায় নারী-শিশুসহ প্রায় ২৫ জন আটকা পড়ে। পরে গভীর রাতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে তাদেরকে উদ্ধার করা হয়। এরআগেই সুযোগ বুঝে টিপুসহ তার অনেক সঙ্গী বাসা থেকে নেমে কৌশলে পালিয়ে যায়। একইদিন আগুন দেওয়া হয় লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরউদ্দিন চৌধুরী নয়ন ও জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি চৌধুরী মাহমুদুন্নবী সোহেলের বাসায়। পরদিন ৫ আগস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার খবরে লক্ষ্মীপুর সর্বস্তরের মানুষ আনন্দ উৎসব পালন করে। আনন্দ মিছিলে ঢল নামে হাজার হাজার মানুষের।

অন্যদিকে ৫ আগস্ট দ্বিতীয়বারের মতো সাবেক এমপি নয়ন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সোহেলের বাসায় আগুন দেওয়া হয়। এসময় একটি চক্র তাদের বাসায় লুটপাট চালায়। এছাড়া একইদিন জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাকিব হোসেন লোটাসের বাসাতেও আগুন জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধরা।

থানা পুলিশ সূত্র জানা যায়, ৪ শিক্ষার্থীসহ ৫ হত্যার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা, পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে একটি ও যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৭ জন হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এরমধ্যে যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মী হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাতদের আসামি করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে। সদর মডেল থানায় ১৪ আগস্ট এসব মামলা দায়ের করা হয়।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের ৫ নেতা জানায়, সেদিন পুলিশ আওয়ামী লীগকে উত্তর তেমুহনী থেকে ঝুমুরের দিকে যেতে নিষেধ করে। পুলিশ বলেছিল, অপ্রীতিকর কোন পরিস্থিতি ঘটলে সামাল দেওয়া যাবে না। এরপরও অতিসাহসী হয়ে ঝুমুরে গিয়ে হামলার ঘটনায় এখন প্রত্যেকটি নেতাকর্মী পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যুবলীগ-ছাত্রলীগের ৭ জনের প্রাণ গেলো। প্রতিটি পরিবার এখন নীরবে কান্না করছে।

শহীদ সাব্বিরের মা মায়া বেগম বলেন, একটা গুলি করতো, তারপরও আমার ছেলে বেঁচে থাকতো। মানুষ মানুষকে এভাবে মারে না। যুবলীগ নেতা টিপু এমনভাবে গুলি করে ঝাঝড়া করলো তার বুকটা। আজ দুই বছর হয়ে গেলো এখনো আমরা বিচার পায়নি। কিছুদিন আগেও দেখেছি একটি ভিডিওতে টিপু কথা বলছে। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না, বিচারও হচ্ছে না।

শহীদ সাদ আল আফনানের মা নাসিমা আক্তার বলেন, ৪ আগস্ট ছেলেকে হারিয়েছি। এর দুইমাস আগে স্বামীকে হারিয়েছি। ছেলে হারানোর দুই বছর পার হলেও এখনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। ভয়ে এখনো বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বাস করি। সন্ত্রাসীরা যেভাবে আফনানকে হত্যা করেছে, পশুপাখিকেও মানুষ এমন ভাবে হত্যা করে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জীবদ্দশায় ছেলে হত্যার বিচার দেখে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন তিনি।

জুলাইযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, মামলা হয়েছে। খুব দ্রুত আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও, নেওয়া হচ্ছে না। গ্রেপ্তার করা হলেও পরবর্তীতে তাদের জামিন হয়ে যায়। রাজনৈতিক নেতারা টাকা খেয়ে লবিং করে আসামিদের সুযোগ করে দিচ্ছে। আমার চেয়েছি লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি হবে না। কিন্তু সকল রাজনৈতিক দলই লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি করছে।

জুলাইযোদ্ধা জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক আকবর হোসেন মুন্না বলেন, সেইদিন সরকার দলের ক্যাডাররা যদি গুলি না ছুঁড়তো, তাহলে লক্ষ্মীপুর শান্ত থাকতো। যুবলীগ সালাহ উদ্দিন টিপু তার বাহিনীকে নিয়ে গুলি করে। এর ফলে ৪ জন শহীদ হয়েছে। মানুষ তখন ক্ষোভে আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি ভয়ানক ছিল। পরিস্থিতি শক্ত হাতে মোকাবেলা করায় ফ্যাসিস্ট পালিয়ে যায়। দেশের রাজনীতিতে যেন আর কখনো অগণতান্ত্রিক সরকার না থাকে।

জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী মহসিন কবীর মুরাদ বলেন, ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুর থেকে স্বৈরাচার পালিয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম কিছু সম্পাদন হয়েছে, আরও কিছু বাকি রয়েছে। পুলিশ প্রতিবেদনগুলো আমরা পর্যালোচনা করছি। হয়তো বাদীর পরিবারের পক্ষ থেকে নারাজি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা নিয়ে কাজ করছি। আন্দোলনের ফসল জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এ সরকারের কাছে আহবান জানাই।

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক এডভোকেট হাছিবুর রহমান বলেন, একটা আইনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। দুইটা মামলাতে ইতিমধ্যে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। চার্জশিটের বিরুদ্ধে বাদী যদি কোন আপত্তি থাকে তিনি নারাজি দিতে পারেন। এগুলো আদালত বিবেচনা করবে।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার দিন ছাত্র-জনতাসহ আমাদের মিছিলে আওয়ামী লীগের কয়েকশত সন্ত্রাসী হামলা করে। তারা বোমা বিস্ফোরণ এবং গুলি ছুঁড়তে থাকে। পরে কয়েকহাজার ছাত্রজনতা তাদেরকে প্রতিরোধ করতে শুরু করে। মাদামে আফনান ও তমিজ মার্কেট এলাকায় সাব্বির, বিজয় ও ওসমান শহীদ হয়। তারা এক হাজার রাউন্ডের ওপর গুলি ছোঁড়ে। দুই শতাধিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছে। লক্ষ্মীপুরে ৪ তারিখেই স্বৈরাচারে বিদায় হয়েছে। ছাত্র-জনতা ও বিএনপি-জামায়াতসহ স্বৈরাচার বিরোধীরা আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল।

লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, শিক্ষার্থী হত্যায় পৃথক দুই মামলাসহ তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩২৮ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ১১৫০ জনকে আসামি করা হয়। পরে ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তদন্ত করা হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশীট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। এরমধ্যে এজাহারনামীয় ২৮৬ জন ও তদন্তে প্রাপ্ত ৩৬৭ জন। মামলার প্রধান আসামী একেএম সালাহ উদ্দিন টিপু দেশে উপস্থিতির তথ্য না থাকায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে আসামীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।