নতুন মা হওয়ার পর অনেকেই একই সমস্যায় পড়েন—শিশু দুধ পাচ্ছে, কিন্তু মুখে নিতে চাচ্ছে না। ফলে কান্নাকাটি বাড়ে। আবার এমনও দেখা যায়, শিশুকে দুধ খাওয়াতে গিয়ে মায়ের স্তনের বোঁটা ফেটে যায়, মা পড়েন বাড়তি কষ্টে। এসব ক্ষেত্রে মায়ের দুধ সঠিকভাবে খাওয়ানোর জন্য কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মানা প্রয়োজন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘পজিশন অ্যান্ড অ্যাটাচমেন্ট’। শিশুর মুখ এবং মায়ের স্তনের অবস্থান ঠিক রাখা এখানে মূল বিষয়।
নবজাতকের জন্য মায়ের বুকের দুধই সবচেয়ে উপযোগী। বিকল্প যাই ভাবা হোক না কেন, মায়ের দুধের বিকল্প হয় না। তবু অনেক সময় শিশুর জন্মের পরপরই দুধ খেতে না পারলে পরিবারে উদ্বেগ তৈরি হয়। দ্রুত সমাধান হিসেবে অনেকে কৌটার দুধ খাওয়ানো শুরু করেন। তবে কৌটার দুধ শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়। অন্যদিকে মায়ের বুকের দুধে নানা রকম পুষ্টি থাকে—এ নিয়ে সংশয়ও কম।
প্রতিবছরের মতো এবারও ১ থেকে ৭ আগস্ট মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালিত হচ্ছে। এই সময়ে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণা ও সঠিক উপায় সম্পর্কে জেনে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
পরিবারে নতুন সদস্যের আগমনের পর দুই ধরনের চিত্র চোখে পড়ে। একটিতে মা–বাবা ও স্বজনেরা উদ্বিগ্ন থাকেন। শিশুর দুধ পাচ্ছে না ভেবে সারাদিন কান্নাকাটি চলে। অস্থির হয়ে একসময় বোতলে করে কৌটার দুধ দিয়ে দেওয়া হয়।
আবার অন্য ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশু মায়ের দুধই খাচ্ছে। কিন্তু সারা দিন অনেকবার পাতলা পায়খানা হচ্ছে। এ নিয়ে আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি কখনো কখনো ডাক্তারও বলেন, ‘মায়ের দুধ শিশুর সহ্য হচ্ছে না।’ তাঁদের পরামর্শে অনেকে দুধ বন্ধ করে দিতে চান।
তবে এ ধরনের ক্ষেত্রে মায়ের দুধে বেশি করে ল্যাকটোজ থাকে—যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করতে পারে বলে বলা হয়। ল্যাকটোজের কারণে শিশুর নরম পায়খানা হতে পারে। এমনকি ২৪ ঘণ্টায় ২৪ বারও একটু একটু করে পায়খানা হওয়াও স্বাভাবিক হতে পারে।
মায়ের দুধ খাওয়ানোর সময় মুখে নিতে চাইছে না কিংবা স্তনের বোঁটা ফেটে যাচ্ছে—এমন পরিস্থিতিতে ‘পজিশন অ্যান্ড অ্যাটাচমেন্ট’ পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মা শিশুকে এমনভাবে কোলে নেবেন যেন শিশুর মাথা মায়ের হাতের কনুইয়ের ওপর থাকে। পুরো হাত দিয়ে শিশুর শরীরে সাপোর্ট দেবেন। শিশুর শরীর মায়ের দিকে ফেরানো থাকবে এবং শিশুর থুতনি মায়ের স্তন স্পর্শ করবে।
অন্য হাত দিয়ে মা তাঁর স্তনকে সাপোর্ট দেবেন। স্তন ধরার ক্ষেত্রে ৪ আঙুল নিচে, বুড়ো আঙুল ওপরে রাখার কৌশল উল্লেখ করা হয়। এভাবে ধরলে স্তনের বোঁটা ও তার ওপরের কালো অংশ শিশুর মুখের ভেতর থাকে। এতে শিশুর পর্যাপ্ত দুধ পেতে সুবিধা হয় এবং মায়ের বোঁটা ফেটে যাওয়ার আশঙ্কাও কমে।
শিশু সারা দিন ঘুমায়, রুচি কম: জন্মের পর শিশু ২২ ঘণ্টা ঘুমায়, এটা স্বাভাবিক। ঘুম থেকে তুলে শিশুকে খাওয়াতে চেষ্টা করবেন না। অনেক ডাক্তারও বলেন ২ ঘণ্টা পরপর দুধ খাওয়াতে। আমি বলব—না, অপেক্ষা করুন। শিশু ঘুম থেকে উঠে হাত–পা নাড়বে, মুখে আঙুল দেবে, বোঝাবে আমি ক্ষুধার্ত, তখনই খেতে দেবেন। সে যতই ছোট হোক না কেন, তাকে বুঝতে চেষ্টা করুন।
শিশু কেন এত কাঁদে: শিশু দুধ পাচ্ছে না, এই অভিযোগ নিয়ে অনেক সময়ই মা–বাবা ডাক্তারের কাছে যান। শিশু কেন এত কাঁদে, তাঁরা বুঝতে পারেন না। মনে রাখবেন শিশু যদি ২৪ ঘণ্টায় ৬ বার প্রস্রাব করে, তাহলে ধরে নিতে হবে সে দুধ পাচ্ছে। কান্নার অন্য কারণ থাকতে পারে, সেটা খুঁজে দেখুন।
বোতলে বুকের দুধ: অনেক সময় মায়েরা বুকের দুধ পাম্প করে বের করে বোতলে ভরে খাওয়ান। তবে ফিডার দিলে শিশু বুঝতে পারে না আসল মা কোনটা। সহজ হয় বলে শিশু ফিডার টানে। ফিডারে অভ্যস্ত হলে সে মায়ের দুধ টেনে খেতে চায় না।
শিশু মায়ের দুধ টানলে প্রোল্যাকটিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা দুধ আরও বাড়াতে সাহায্য করে। মায়ের দুধ না টানলে একসময় দুধ শুকিয়ে যায়। মাকে যদি বাইরে যেতে হয়, তাহলে দুধ বের করে কাপে রেখে যাবেন। শিশুর প্রয়োজনে অন্যরা সেই দুধ তাকে খাওয়াতে পারবেন। মায়ের দুধ বাইরে ৬ ঘণ্টা, রেফ্রিজারেটরে ১২ ঘণ্টা সংরক্ষণ করা যায়।
বাড়ির মুরব্বিরা অনেক সময় শিশুকে অন্য রুমে রেখে মাকে বিশ্রামের সুযোগ করে দেন। তবে সফলভাবে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে চাইলে শিশুকে অবশ্যই মায়ের সঙ্গে একই রুমে, একই বিছানায় রাখতে হবে। এতে শিশু যখন প্রয়োজন তখনই খেতে পারবে। মায়ের শরীরের উষ্ণতায় শিশু বড় হবে।