দেশের ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবিকার মূল ভিত্তি এখন পশুপালন। ধান, পাট কিংবা শাকসবজির মতো ফসল ফলিয়ে যে আয় হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা আয় করছেন তাঁরা হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন থেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। গত ডিসেম্বরে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে পরিচালিত এই জরিপের ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বিবিএস ‘ক্ষুদ্র ও বৃহৎ খাদ্য উৎপাদকদের আয় ও উৎপাদনশীলতা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এই গবেষণাটি পরিচালনা করে। আট বিভাগের মোট ১২ হাজার ৮৭৯টি পরিবার এবং কৃষিভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক খামারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। জরিপে ধান, শাকসবজি ও ডালের মতো স্বল্পকালীন ফসল; ফলমূলের মতো দীর্ঘমেয়াদি ফসল; বনায়ন; গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি এবং মৎস্য চাষ—এই পাঁচটি খাতের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

জরিপের তথ্যানুযায়ী, দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ খাদ্য উৎপাদকই ক্ষুদ্র পর্যায়ের, যা প্রমাণ করে কৃষি খাতে ক্ষুদ্র কৃষকদের অংশগ্রহণই সবচেয়ে বেশি। তবে আয়ের ক্ষেত্রে বড় ব্যবধান বিদ্যমান। একজন ক্ষুদ্র কৃষক বছরে গড়ে ৩৩ হাজার ৬৩৯ টাকা নিট আয় করেন, যেখানে একজন বড় কৃষকের গড় বার্ষিক আয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৫৬ টাকা। অর্থাৎ বড় কৃষকদের তুলনায় ক্ষুদ্র কৃষকদের আয় প্রায় চার গুণ কম।

ক্ষুদ্র কৃষকদের এই সীমিত আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশই আসে পশুপালন খাত থেকে। এই খাত থেকে তাঁরা বছরে গড়ে ২৮ হাজার ৪২১ টাকা আয় করেন। বিপরীতে, আমন, বোরো, গম বা শাকসবজির মতো অস্থায়ী ফসল থেকে তাঁদের গড় বার্ষিক আয় মাত্র ৪ হাজার ৫৯১ টাকা এবং স্থায়ী বাগান বা ফলমূল থেকে আয় গড়ে ২ হাজার ৩৩১ টাকা। এছাড়া মাছ চাষ থেকে ক্ষুদ্র কৃষকদের গড় আয় ১২ হাজার ৬৭০ টাকা এবং বনশিল্প থেকে আয় ১০ হাজার ৮৯২ টাকা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুদ্র কৃষকদের নিজস্ব জমির পরিমাণ অত্যন্ত কম হওয়ায় এবং বীজ, সার ও কীটনাশকের উচ্চমূল্যের কারণে ফসল চাষে লাভ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে পশুপালন তাঁদের জন্য অধিক লাভজনক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, “গ্রামের গৃহস্থ পরিবার অল্প পুঁজিতে ও বসতবাড়ির আঙিনায় হাঁস–মুরগি ও পশুপালন করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারী ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য পশুপালন এখন আয়ের একটি বড় উৎস। গত কয়েক বছরে কোরবানির সময় দেশীয় গরু–ছাগলের চাহিদা বেড়েছে। ফলে গ্রামের গৃহস্থেরা এক–দুটি পশু পালন করে বছর শেষে ভালো আয় করতে পারেন। এ জন্য আলাদা কাজের মানুষ রাখতে হয় না। বাড়ির গৃহিণীই অন্যান্য কাজের পাশাপাশি গবাদিপশুর দেখভাল করতে পারেন। আবার মুরগি পালন ও ডিম বিক্রি করাও এখন ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য লাভজনক।”

তবে এই খাতের চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করে মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, “গবাদিপশুর খাদ্যের দাম অনেক বেশি। এ ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার অভাব রয়েছে। এ জন্য খরচ সামলাতে তাঁদের সহজে ও কম সুদে ছোট ঋণ দেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে পশুখাদ্যের দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। আর গ্রাম পর্যায়ে পশুর চিকিৎসার আধুনিক সুযোগ–সুবিধা পৌঁছানো গেলে ক্ষুদ্র কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি স্বাবলম্বী হতে পারবেন।”